suchandradas

প্রতিটা দোলেরই একটা চোরা বিষণ্ণতা থাকে। আগে বহুবার ভেবেছি, হয়তো ডায়েরীতে লিখেওছি। উৎসবের সেই চড়া আলো আর আবিরের মাতামাতির মধ্যে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা ওত পেতে থাকে। যখন চারদিকে রঙের বন্যা বয়ে যায়, যখন অচেনা মানুষের ভিড়ে চেনা মুখগুলো হারিয়ে যায়, তখন বুকের ঠিক মাঝখানটায় একটা অদ্ভুত শূন্যতা টের পাওয়া যায়। বিকেলের দিকে যখন দাপাদাপি কমে আসে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে পড়ে থাকে ছেঁড়া আবিরের প্যাকেট, ছেঁড়া গেঞ্জি আর ভিজে রঙের দাগ, তখন শহরটাকে বড় বেশি ক্লান্ত মনে হয়। সেই ক্লান্তির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে যায় কতগুলো পুরনো দোলের কথা। সেই দাদু যাকে আবির দিয়ে প্রণাম করলেই ১০ টাকা পেতাম, ক্যান্সারের থার্ড স্টেজে দাঁড়ানো ঠাম্মা, যে ঝুপ করে এসে রং মাখিয়ে জাপটে ধরতো, সেই মেয়েটি, যার গালে প্রথম আবির ছোঁয়াতে গিয়ে হাত কেঁপে উঠেছিল – তারা আজ কোথায়?

রঙের উৎসব শেষ হলে মানুষ যখন কলতলায় গিয়ে সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে গায়ের রঙ তোলে, তখন সে তার শরীরের ওপর থেকে একটা আনন্দের মুহূর্তকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু মনের ভেতরে যে চোরা রঙ লেগে থাকে, তা কি অত সহজে মোছা যায়? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীললোহিত হয়তো এরকম বিকেলেই কোনো এক গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বসতেন। দেখতেন, নদীর জলের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে লাল আর গোলাপি রঙের আভা। প্রকৃতি তার সমস্ত রঙ বিলিয়ে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। আমি দেখেছি প্রতিটা দোলের শেষে যে ফিকে হয়ে আসা গোধূলি নামে তা মিলিয়ে যেতে যেতে না থাকে সেই রঙ, না সেই মুহূর্ত, আর না সেই মানুষগুলো। দোলের এই বিষণ্ণতাটুকুই আমাদের বলে দেয়, আমরা বেঁচে আছি, আমাদের ভেতরে এখনো এক চিলতে স্মৃতি আর এক ফোঁটা দীর্ঘশ্বাস অবশিষ্ট আছে।

উৎসবের শেষে বাড়ি ফেরার পথে পকেটে হাত দিয়ে দেখি এক চিমটি শুকনো আবির।

প্রতিটা দোলেরই একটা চোরা বিষণ্ণতা থাকে। ~ সুচন্দ্রা দাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Instagram

This error message is only visible to WordPress admins

Error: No feed found.

Please go to the Instagram Feed settings page to create a feed.