suchandradas

সরাসরি গল্পে যান
হররবাংলা ছোটগল্প

ধুলো চচ্চরি

খেলা জিনিসটা ছেলেখেলা নয় রে মা।
সব খেলাই একটা পালা।

গল্পটি পড়ুন
মোচড়ানো আমড়া গাছের ডালে হাঁটু ভাঁজ করে বসে থাকা এক অস্বাভাবিক রোগা অবয়ব; নীল-কালো ভৌতিক ইলাস্ট্রেশন।
গল্পের সঙ্গে লেখকের দেওয়া ইলাস্ট্রেশন
ধুলো চচ্চরি ০% পড়া হয়েছে

সে বছর বৈশাখে বীরভূমের আকাশ থেকে এক ফোঁটা জল নামেনি।

খয়েরবুনি গ্রামের মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে পড়ে ছিল, বুড়ো মানুষের হাতের তালুর মতন। কোপাইয়ের যে সরু শাখাটা গ্রামের পুব দিক দিয়ে বয়ে যেত, তার বুকে তখন শুধু ফাটা কাদার চাকতি। আর সেই চাকতিগুলোর ফাঁকে ফাঁকে পড়ে থাকত মরা শামুকের সাদা খোল।

দুপুর হলে লাল মাটি এমন তেতে উঠত যে খালি পায়ে হাঁটা যেত না। বিকেল নামলেই পশ্চিম থেকে উঠত গরম, শুকনো, লালচে বাতাস। সেই বাতাস মাঠের ধুলো তুলে নিয়ে আসত গ্রামে। সব জায়গা দিয়ে ধুলো ঢুকত। দরজার ফাঁক দিয়ে, জানলার উপর দিয়ে, ঘুলঘুলি দিয়ে, আর জমত কলসির কানায়, চালের বাতায়, ঘুমন্ত মানুষের চোখের পাতায়। মেয়েরা পরদিন সকালে উঠোন নিকোত, দুপুরের আগেই আবার লাল হয়ে যেত উঠোন।

গ্রামের দক্ষিণ সীমানায়, পুরোনো ঘাটের ধসে পড়া সিঁড়ির পাশে, একটা আমড়া গাছ ছিল। কতকালের, কেউ বলতে পারত না। গুঁড়িটা মোচড়ানো, ভেজা কাপড় নিংড়ালে যেমন হয় ঠিক তেমন। ডালগুলো ছড়ানো, নিচু, তাতে টক আমড়া ঝুলত শ্রাবণ মাসে।

গাছতলার জমিটা পরিষ্কার, সমান, ছায়া ঢাকা। গ্রামের ছেলেমেয়েদের খেলার জায়গা ওটাই। বড়রা ওদিকটা এড়িয়ে চলত, কারণ ঘাট পেরোলেই শ্মশান। কিন্তু ছোটদের কাছে শ্মশান মানে শুধু কয়েকটা পোড়া কাঠ আর একটা ভাঙা মাটির হাঁড়ি। ভয়ের চেয়ে খেলা বড়।

বিকেলে ছয়জন জড়ো হত। পুঁটি, ভোম্বল, কেষ্ট, রিনা, ছোটন আর নিতাই।

খেলার জিনিস সামান্য। ধুলো, বালি, কাদা, তেঁতুলের বিচি। ওরা কাঁইবিচি বলত। আর ভাঙা হাঁড়ির খোলামকুচি, শুকনো কাঠিকুটি, আমড়ার আঁটি। এ দিয়েই ঘর হত, হাট হত, রাজ্য হত।

খেলার নিয়মও কেউ লিখে দিয়ে যায়নি। কোন বাপ দাদার আমল থেকে মুখে মুখে চলে আসছে, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে একটু করে বদলে গেছে, তবু ভেতরের বাঁধনটা আলগা হয়নি। লোকখেলায় কোনো রেফারিও হয় না আম্পায়ারও হয় না। যারা খেলে, তারাই নিয়ম মানে, তারাই নিয়ম মানায়।

দলের মাথা ছিল পুঁটি। এই খেলায় যে দলনায়ক, তাকে বলে বুড়ি। তার নেতৃত্বেই গোটা খেলা চলে। নয় বছরের পুঁটি তাই সবার বুড়ি। ওর কথাতেই খেলা শুরু হত, ওর কথাতেই থামত।

কেউ খেলা নিয়ে ভুল কথা বললে পুঁটিই চোখ পাকিয়ে বলত, থুথু ফেলে থুড়ি বল। আর খেলার মাঝে দম নেওয়ার দরকার হলে ডান হাতের তালু মুখে চেপে আওয়াজ করত - আব্বা। তাতেই খেলা থেমে যেত কিছুক্ষণের জন্য।

ওরা সবাই একসাথে খেলতো ঠিকই কিন্তু নিতাইয়ের কথা একটু আলাদা করে বলা দরকার। হারান ভাগচাষির ছেলে। রোগা, লম্বাটে মাথা, পাঁজরের হাড় গোনা যায়। খেলায় ওকে নেওয়া হত, কিন্তু কেউ ওকে প্রতিদ্বন্দ্বী বলে গুনত না। ও ছিল দুদুভাতু। খেলে, অথচ ওর জেতা হারার কোনো দাম নেই।

সেদিনের আগে পর্যন্ত।

সেদিন বিকেলে খেলা হচ্ছিল চোর ধরা। আঙুল গুনে গুনে ছড়া কাটা হল, আর গুনতি গিয়ে থামল নিতাইয়ের বুকে।

নিয়ম পরিষ্কার। যার ওপর গুনতি থামে, তাকে ফল নিতে হয়। গাঁয়ের লোক বলে ' ফোল '। ফল মানে শাস্তি, ফল মানে দায়। তাকে গাছের গুঁড়িতে মুখ রেখে চোখ বুজে গুনতে হবে, তারপর খুঁজে খুঁজে সবাইকে ধরতে হবে। গোটা খেলাটা তখন তারই হাতে।

লোকখেলায় এই মানুষটার নাম এক এক জায়গায় এক এক রকম হয়। বর্ধমান, বীরভূম আর মুর্শিদাবাদে তাকে বলে চোর, নয়তো মুচি। কোথাও আবার বলে হাঁড়ি। খয়েরবুনিতে বলত মুচি।

"নিতাই মুচি" ভোম্বল চেঁচিয়ে উঠল।

নিতাই নড়ল না। পশ্চিমের আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। সূর্য তখন তালগাছের মাথা ছুঁয়েছে, আলো ঘোলাটে লাল।

"আমি মুচি হব না," নিতাই খুব আস্তে আস্তে বলল "বাড়ি যাব। বাবা বলেছে সাঁঝের আগে ফিরতে।"

একটা মুহূর্ত কেউ কিছু বলল না। তারপর ঘটে গেল সেটাই, যা লোকখেলায় চিরকাল ঘটে এসেছে। কেউ ফল না নিলে, মানে মুচি হতে রাজি না হলে, বাকি সবাই একজোট হয়ে যায়। তখন আর বন্ধু শত্রু থাকে না। থাকে শুধু একটা দল, আর একজন অপরাধী। সেই অপরাধীকে রাগানোর জন্য, লজ্জা দেওয়ার জন্য আছে একটা ছড়া। কে বেঁধেছিল কেউ জানে না। কবে থেকে বলা হচ্ছে, তাও কেউ জানে না।

পুঁটিই প্রথম শুরু করল। বুড়ি হিসেবে সেটা তারই কাজ।

হাতে তালি দিয়ে, পা ঠুকে, ঘুরে ঘুরে, পাঁচজনে মিলে নিতাইকে ঘিরে ধরল —

ফোল (ফল) নেয় নাই ফোলুটি
আমড়া গাছে টিয়ে
তার বাবা ভাত খায়
ধুলো চচ্চরি দিয়ে।।

একবার। দু'বার। তিনবার। প্রতিবার গলা চড়ছিল, তালির শব্দ জোরালো হচ্ছিল। কেষ্ট মাটি থেকে এক মুঠো লাল ধুলো তুলে নিতাইয়ের মাথায় ছুড়ে দিল। "নে, তোর বাপের চচ্চড়ি।" সবাই হেসে উঠল।

অন্য যে কোনো ছেলে হলে রেগে যেত, মারামারি করত, কিংবা শেষমেশ হার মেনে গুঁড়িতে মুখ রেখে গুনতে শুরু করত। ছড়াটার কাজ তো সেটাই। নিতাই তার কোনোটাই করল না। ধুলোমাখা মাথা নিয়ে সে একবার সবার মুখের দিকে তাকাল। পুঁটি পরে বহুবার মনে করার চেষ্টা করেছিল সেই চাউনিটা। রাগ ছিল না তাতে, কান্নাও না। ছিল এমন কিছু, যা নয় বছরের মেয়ের বোঝার কথা নয়। যেন ওদের ছড়াটা কোনো গোপন কথা ফাঁস করে দিয়েছে, আর নিতাই অবাক হয়ে ভাবছে, ওরা জানল কী করে। তারপর সে ঘুরে দাঁড়াল, আর তরতর করে উঠে গেল আমড়া গাছে।

ঠিক ছড়ায় যেমন বলা আছে। আমড়া গাছে টিয়ে।

একেবারে মগডালে গিয়ে বসল সে, পাতার আড়ালে। ওরা নিচ থেকে ডাকল, ঢিল ছুড়ল, ধুলোর ডেলা ছুড়ল। নিতাই নামল না, সাড়াও দিল না। শুধু বসে রইল, হাঁটু দুটো বুকে জড়িয়ে, একটা রোগা পাখির মতো।

আলো মরে আসছিল। শ্মশানের দিক থেকে শেয়াল ডাকল একবার। পুঁটির হঠাৎ গা ছমছম করে উঠল।

"থাক, ও থাকুক," সে বলল। "চল।"

ওরা সবাই চলে গেল। পেছনে আমড়া গাছটা অন্ধকারে মিশে যেতে লাগল, আর তার মাথায় রয়ে গেল একটা রোগা পাঁজর বের করা ছেলে

সে রাতে ঝড় উঠল। বৃষ্টি নামল না, শুধু ঝড়। পশ্চিমের মাঠ থেকে গোঙাতে গোঙাতে এগিয়ে এল বাতাস, সঙ্গে নিয়ে এল মাঠের সব ধুলো। খয়েরবুনির মানুষ দরজা জানলা এঁটে বসে রইল। তবু ফাঁকফোকর দিয়ে লাল গুঁড়ো ঢুকে পড়ল ঘরে। লম্ফর শিখা কাঁপতে কাঁপতে নিভে গেল।

পুঁটি মায়ের পাশে শুয়ে শুনছিল টিনের চালে ধুলোর শব্দ। বৃষ্টির মতো, অথচ বৃষ্টি নয়। শুকনো, খসখসে, অবিরাম। যেন কেউ সারা রাত ধরে চালের ওপর মুঠো মুঠো ধুলো ছড়াচ্ছে। আর মাঝরাতে, ঝড়ের গোঙানির ফাঁকে, পুঁটির মনে হয়েছিল সে শুনল, দক্ষিণের দিক থেকে, অনেক দূর থেকে কেউ গুনছে।

এক... দুই... তিন...

সকালে নিতাইকে পাওয়া গেল আমড়া গাছের তলায়।

ঝড়ের মধ্যে মগডাল থেকে পড়ে গেছিল। শরীরটা বেঁকে পড়ে ছিল গুঁড়ির গোড়ায়, ঠিক যেখানে মুচিকে মুখ রেখে গুনতে হয়। কিন্তু গ্রামের লোক যা দেখে পিছিয়ে এসেছিল, তা পড়ে যাওয়া নয়।

নিতাইয়ের মুখ খোলা। আর সেই মুখের ভেতরটা ঠাসা ছিল লাল ধুলোয়। গাল ফুলে উঠেছিল, ঠোঁটের কোণ দিয়ে উপচে পড়ছিল গুঁড়ো, নাকের ফুটো দুটোও বোজা। যেন কেউ হাত দিয়ে ঠেসে ঠেসে খাইয়েছে তাকে। নাকি নিজেই খেয়েছে, পেট ভরে, শেষ গ্রাস পর্যন্ত।

খবর দিতে লোক গেল হারানের কুঁড়েতে। দরজা ভেজানো ছিল। ভেতরে হারান মেঝেতে বসে, সামনে একটা কানা ভাঙা কাঁসার থালা। লোকজন ঢুকতে সে মুখ তুলে চাইল, কিন্তু চিনতে পারল বলে মনে হল না।

থালায় ছিল ভাত। ঠিক দুমুঠো। আর সেই ভাতের সঙ্গে মাখা ছিল লাল ধুলো। অনেকটা ধুলো। যতটা মেশালে দুমুঠো ভাত চার মুঠো দেখায়, পেট ভরা ভরা লাগে। কেউ কিছু বলল না। কিন্তু সবাই বুঝল। মাসের পর মাস খরা, ধানের গোলা ফাঁকা, মহাজনের দেনা। হারানের ঘরে ভাত বাড়ানোর আর কোনো উপায় ছিল না। নিতাই রোজ সাঁঝে বাড়ি ফিরে বাবার সামনে সেই থালা সাজিয়ে দিত।

ওদের ছড়াটা তাই.....।

নিতাইয়ের শ্রাদ্ধ-শান্তি যা হবার হল, অভাবের সংসারে যতটুকু হয়। হারান কোথায় চলে গেল কেউ জানল না। এক সকালে দেখা গেল কুঁড়ে ফাঁকা। মেঝেতে শুধু পড়ে আছে সেই কাঁসার থালা, তাতে পুরু হয়ে জমেছে ধুলো।

আমড়াতলায় আর কেউ খেলতে যেত না। পুঁটি রাতে ঘুমোতে পারত না। চোখ বুজলেই দেখত নিতাইয়ের সেই চাউনি। একদিন ঠাকুমার কাছে গিয়ে সব বলে ফেলল। খেলার কথা, ছড়ার কথা, নিতাইয়ের মুচি না হওয়ার কথা।

ঠাকুমা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। বাইরে তখন দুপুরের রোদ, উঠোনের ধুলো ঝিকমিক করছে, একটা কাক বসে আছে শুকনো কুয়োর পাড়ে। তারপর তিনি খুব নিচু গলায় বললেন, খেলা জিনিসটা ছেলেখেলা নয় রে মা। এসব হলো যাত্রা পালা। সব খেলাই একটা পালা।

আর পালা শুরু হলে তাকে শেষ করতে হয়। ফল যার পাওনা, সে ফল না নিলে খেলা শেষ হয় না। খেলা ঝুলে থাকে। মাঝখানে, অর্ধেক হয়ে।

"কিন্তু নিতাই তো..." পুঁটি থেমে গেল। ঠাকুমা ওর মাথায় হাত রাখলেন। হাতটা ঠান্ডা।

"থুথু ফেলে থুড়ি বল," বললেন তিনি। "যা ভুল বলেছিস, ফিরিয়ে নে।"

পুঁটি উঠোনে গিয়ে থুথু ফেলল, বলল, থুড়ি। তিনবার।

কিন্তু থুথুটা লাল মাটিতে পড়তেই শুষে নিল ধুলো। এক নিমেষে। যেন তৃষ্ণার্ত কিছু অপেক্ষা করে ছিল তার জন্য।

প্রথমে গেল ভোম্বল।

নিতাই মারা যাওয়ার ঠিক সাত দিনের মাথায়। সেদিন বিকেলে আবার পশ্চিম থেকে বাতাস উঠেছিল। মাঠের ওপর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে আসছিল ছোট ছোট ধুলোর ঘূর্ণি। গাঁয়ের লোক যাকে বলে বাউরি বাতাস।

ঘূর্ণিগুলো গ্রামের কোনো উঠোনে ঢুকল না। সোজা গিয়ে থামল আমড়াতলায়। গাছের চারপাশে পাক খেতে লাগল, যেমন করে ছেলেমেয়েরা পাক খায় কাউকে ঘিরে।

সে রাতে ভোম্বলের মা শুনেছিলেন, ছেলে ঘুমের মধ্যে গুনছে। এক, দুই, তিন। থামছে, আবার গুনছে। ভোরবেলা ভোম্বলের বিছানা ফাঁকা। ওকে পাওয়া গেল আমড়া গাছের তলায়, গুঁড়িতে মুখ ঠেকিয়ে বসা, যেমন করে মুচি বসে গোনে। মুখভর্তি লাল ধুলো।

তারপর কেষ্ট, তিন দিন পর। যে কেষ্ট সেদিন প্রথম মুঠো ধুলো ছুড়েছিল নিতাইয়ের মাথায়। ওর মুখে ধুলো এত বেশি ঠাসা ছিল যে চোয়ালটা খুলে ঝুলে পড়েছিল।

তারপর রিনা। তারপর ছোটন।

প্রতিবার আগের সন্ধ্যায় বাউরি বাতাস উঠত। প্রতিবার ঘূর্ণিগুলো গিয়ে থামত আমড়াতলায়। আর প্রতিবার রাতে, ঝড়ের শব্দের ভেতর থেকে, গ্রামের কেউ না কেউ শুনত একটা সরু, খসখসে গলা। বালির ওপর দিয়ে কিছু টেনে নিয়ে যাওয়ার মতো গলা। ছড়া কাটছে। সেই একই ছড়া, অবিকল নিতাইয়ের গলা।

ফোল (ফল) নেয় নাই ফোলুটি
আমড়া গাছে টিয়ে
তার বাবা ভাত খায়
ধুলো চচ্চরি দিয়ে।।

গ্রামের মানুষ ওঝা ডাকল। ওঝা আমড়াতলায় গিয়ে সরষে পোড়া দিল, ধুনো দিল, গাছের গুঁড়িতে লাল সুতো বাঁধল। পরদিন সকালে দেখা গেল সুতোটা ছেঁড়া। আর ওঝার ঝোলার ভেতর থেকে ঝুরঝুর করে পড়ছিল লাল ধুলো। ওঝা সেদিনই গ্রাম ছাড়ল।

পুঁটি বুঝে গিয়েছিল। এবার আর কারও বোঝানোর দরকার ছিল না।

নিতাই ফল নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত। মুচি হয়েছে সে, যেমন হওয়ার কথা ছিল। চোখ বুজে গুনেছে, তারপর খুঁজতে বেরিয়েছে। একে একে ধরছে সবাইকে। আর ধরা পড়লে কী ফল পেতে হয়, নিতাই নিজেই ঠিক করছে। সেই ফল, যেটা সবাই মিলে ছড়া কেটে ওর বাবার কপালে লিখে দিয়েছিল।

এবার খেলার আর কেউ বাকি নেই। শুধু বুড়ি।

পুঁটির বাবা ঠিক করলেন, মেয়েকে বর্ধমানে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দেবেন। সেদিনই, দুপুরের মধ্যে। গোরুর গাড়ি জোড়া হল। মা আঁচলে চোখ মুছে পুঁটির হাতে এক পুঁটলি গুঁড়-মুড়ি গুঁজে দিলেন। গাড়ি ছাড়ল বেলা থাকতে থাকতে। লাল মোরামের রাস্তা, দুপাশে ফাটা মাঠ, দূরে দূরে একলা তালগাছ। গোরু দুটো মাথা নিচু করে হাঁটছিল। পুঁটি ছইয়ের ভেতর বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল। প্রতিটা চাকার পাকে খয়েরবুনি পিছিয়ে যাচ্ছে, আর একটু, আর একটু।

বিকেলের দিকে আবার বাতাস উঠল। প্রথমে দূরে, দিগন্তের কাছে, একটা লালচে আভা। তারপর সেটা উঁচু হতে লাগল, চওড়া হতে হতে দেয়ালের মতো এগিয়ে আসতে লাগল মাঠের ওপর দিয়ে। গাড়োয়ান গোরু থামিয়ে গামছায় মুখ ঢাকল। তারপর ঝড়টা এসে পড়ল ওদের ওপর।

চারদিক লাল। আকাশ নেই, মাঠ নেই, রাস্তা নেই। শুধু ধুলো আর ধুলো। চোখে, কানে, নাকে, দাঁতের ফাঁকে। পুঁটি ছইয়ের ভেতর গুটিসুটি মেরে আঁচল চাপা দিল মুখে।

কতক্ষণ কেটেছিল সে জানে না। গাড়িটা আবার চলতে শুরু করল, সেটুকু টের পেয়েছিল। ঢিমে তালে, দুলতে দুলতে। গাড়োয়ান কিছু বলছিল না। গোরুর গলার ঘণ্টাও বাজছিল না।

যখন ঝড় থামল, তখন সন্ধে। গাড়িটা থামতেই পুঁটি ছইয়ের বাইরে মুখ বাড়াল। সামনে একটা ধসে পড়া ঘাটের সিঁড়ি। তার পাশে মোচড়ানো গুঁড়ির একটা আমড়া গাছ। গাড়োয়ানের জায়গাটা ফাঁকা। গোরু দুটো নেই। জোয়ালটা পড়ে আছে মাটিতে, তার ওপর পুরু লাল ধুলো, যেন বহু বছর কেউ ছোঁয়নি।

পুঁটি নামল। নামতে চায়নি, তবু পা দুটো নিজে থেকেই মাটি ছুঁল।

এই গাছতলার জমিটা আগের মতোই পরিষ্কার, সমান। কেউ যেন সদ্য ঝাঁট দিয়ে রেখেছে খেলার জন্য। জমির ওপর গোল করে সাজানো চারটে ছোট্ট ঢিবি, লাল ধুলোর। কাঁইবিচি দিয়ে চোখ বসানো, খোলামকুচি দিয়ে মুখ। পুঁটি চিনল। ভোম্বল, কেষ্ট, রিনা, ছোটন। আর তাদের মাঝখানে, বৃত্তের ঠিক কেন্দ্রে, একটা কানা ভাঙা কাঁসার থালা। থালায় ভাত। ঠিক দুমুঠো, তার বেশি নয়। আর ভাতের ওপর পুরু করে লাল ধুলো।

মাথার ওপর পাতা নড়ল। পুঁটি ওপরে তাকাল না। তাকাতে হল না। সে জানত মগডালে কে বসে আছে, হাঁটু দুটো বুকে জড়িয়ে। তারপর গাছের ওপর থেকে নেমে এল গোনার শব্দ।

এক... দুই... তিন...

শেষ চেষ্টা। পুঁটি ডান হাতের তালু মুখে চেপে ধরল। খেলা থামানোর নিয়ম - আব্বা। গলা দিয়ে আওয়াজটা বের করতে গেল সে। আওয়াজ বেরোল না। তালুর নিচে, ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে, মুখের ভেতর ঢুকে আসছিল। শুকনো। খসখসে। গরম। জিভের ওপর জমছিল, গলার দিকে নামছিল। ধুলো।

পুঁটি হাতটা সরিয়ে দেখল। তালুটা লাল।

লোকখেলায় রেফারি, আম্পায়ারের বালাই নেই। যে খেলে, সেই নিয়ম বানায়, সেই মানে। আর যে মানে না, তার জন্য বাকি সবাই একজোট হয়।

পুঁটির চারপাশে ধুলোর ঢিবিগুলো নড়ে উঠল। পাক খেতে লাগল, ঠিক যেমন করে ছেলেমেয়েরা পাক খায় কাউকে ঘিরে। চারটে ঢিবি থেকে চারটে খসখসে গলা, আর গাছের মাথা থেকে পঞ্চম গলাটা, একসঙ্গে ছড়া ধরল -

ফোল (ফল) নেয় নাই ফোলুটি
আমড়া গাছে টিয়ে
তার বাবা ভাত খায়
ধুলো চচ্চরি দিয়ে।।

পুঁটি থালাটার দিকে তাকাল। তারপর হাঁটু গেড়ে বসল। ফল নিতে হয়। এটাই নিয়ম। সেই তো সবাইকে শিখিয়েছিল।

বর্ধমানে মামার বাড়িতে গাড়ি কোনোদিন পৌঁছোয়নি।

গাড়োয়ানকে পাওয়া গেল মাঠের মধ্যে, ক্রোশখানেক দূরে, অচেতন। ঝড়ের কথা তার কিছুই মনে ছিল না। গোরু দুটো নিজেরাই ফিরে এসেছিল খয়েরবুনির গোয়ালে, গায়ে পুরু লাল ধুলো। পুঁটিকে পাওয়া গেল আমড়া গাছের তলায়। গুঁড়িতে মুখ ঠেকিয়ে বসে ছিল, দুহাত চোখের ওপর। মুখভর্তি লাল ধুলো। পাশে উপুড় হয়ে পড়ে ছিল একটা কানা ভাঙা কাঁসার থালা, চেটেপুটে সাফ।

গ্রামের লোক প্রথমে ভেবেছিল, এবার বুঝি শেষ। বুড়িও ধরা পড়েছে, খেলার আর কেউ বাকি নেই। ফল নেওয়া হয়ে গেছে।

ভুল ভেবেছিল।

পুঁটি শুধু ধরা পড়েনি। পুঁটি বসে ছিল মুচির জায়গায়, মুচির ভঙ্গিতে। লোকখেলায় যে ধরা পড়ে, পরের দানে সেই মুচি হয়। এটাও নিয়ম। আর পুঁটির চেয়ে নিয়ম ভালো কে জানত?

নিতাই নিজের দান খেলে নিয়েছে। এবার পুঁটির পালা গোনার। আর খুঁজে বের করার।

সে বছর বর্ষা এসেছিল দেরিতে। তারপর আরও অনেক বর্ষা এসেছে, গেছে। কোপাইয়ে জল ফিরেছে, মাঠে ধান ফিরেছে। খয়েরবুনির ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে, তাদের ছেলেমেয়ে হয়েছে। কিন্তু বৈশাখ এলে, যেদিন পশ্চিম থেকে শুকনো বাতাস ওঠে, খয়েরবুনির মায়েরা বিকেল থাকতেই ছেলেমেয়েদের ঘরে টেনে আনে। দরজায় খিল দেয়। কাউকে ছড়া কাটতে দেয় না। কোনো ছড়া না।

কারণ সেসব দিনে, সন্ধে নামলে, আমড়াতলা থেকে ভেসে আসে একটা সরু মেয়েলি গলা। গুনছে।

এক... দুই... তিন...

সুচন্দ্রা দাস

লেখক, আলোকচিত্রী ও শিল্পী।
গল্পে, ছবিতে, শব্দে নিজের মতো করে জীবনকে দেখা।

গল্পটা মনে থেকে গেল?