suchandradas

সরাসরি গল্পে যান
গল্পবাংলা গল্প

রূপবাণী

একটা হারিয়ে যাওয়া ছবির শেষ চিহ্ন,
আর একটা হারিয়ে যাওয়া মেয়ের প্রথম চিহ্ন।
দুটোই একই কৌটোয়।

গল্পটি পড়ুন
রূপবাণী লেখা প্রচ্ছদে উত্তর কলকাতার গলিতে এক নারী আলোর দিকে ফিল্মের ফ্রেম তুলে ধরেছেন; ফ্রেমে দুর্গার মুখ, কমলা ও কালো ইলাস্ট্রেশন।
গল্পের সঙ্গে লেখকের দেওয়া ইলাস্ট্রেশন
রূপবাণী ০% পড়া হয়েছে
সূচিপত্র · সাতটি অধ্যায়

এক

পুজোর আগের হাতিবাগানের ভিড়ে ঝোলা কাঁধে এক মহিলা, পেছন থেকে দেখা।
“যা হারায়, তার খোঁজ মেলে কদাচিৎ। তবু আমরা খুঁজি।”

নাম রাখায় রবীন্দ্রনাথের জুড়ি ছিল না, এ কথা সবাই জানে। কিন্তু উত্তর কলকাতার একটা সিনেমা হলের নামও যে তাঁরই রাখা, সে খবর আজ ক'জন মনে রাখে? হাতিবাগান থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে স্ক্রিন কর্পোরেশন লিমিটেড নতুন চিত্রগৃহ তৈরি করেছিল। ১৯৩২ সালের ১৯ ডিসেম্বর তার উদ্বোধন হয়, কবি নিজে পৌরোহিত্য করেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন রূপবাণী।

রূপ আর বাণী। ছবি আর কথা। যে পর্দা সবে কথা বলতে শিখেছে, তার এর চেয়ে লাগসই নাম আর হয় না।

হলটা এখন আর নেই, ভেঙে ফেলা হয়েছে। ২০২৬ সালের অক্টোবরের গোড়ায়, এক সোমবার দুপুরে বিধান সরণীর ফুটপাতে দাঁড়িয়ে যে জায়গাটার দিকে আমি তাকিয়ে ছিলাম, সেখানে রূপবাণীর কোনো চিহ্ন ছিল না। একটা পানের দোকানের বুড়ো মালিক আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। নইলে জানার কোনো উপায় নেই।

আমার পেশায় এমন অভিজ্ঞতা নতুন নয়। আমি পুনের ফিল্ম আর্কাইভে কাজ করি। বাইশ বছর ধরে পুরোনো নাইট্রেট আর অ্যাসিটেট রিলের সঙ্গে আমার ঘর। ছবি কীভাবে হারায়, আমি জানি। আগুনে পোড়ে, ভাপে গলে আঠা হয়ে যায়, ভিনিগারের টক গন্ধ ছেড়ে কুঁকড়ে যায়, কিংবা নিছক অবহেলায় কোনো গুদামের কোণে পড়ে থেকে একদিন ময়লার গাড়িতে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের নিজের পরিচালনা করা একমাত্র ছবি 'নটীর পূজা' ও নিউ থিয়েটার্সের আগুনে গেছে। শান্তিনিকেতনে একফালি টুকরো ছাড়া কিছু টেকেনি।

যা হারায়, তার খোঁজ মেলে কদাচিৎ। তবু আমরা খুঁজি। আর্কাইভের লোকেদের এটাই রোগ।

আমার নিজের রোগটা অবশ্য আরও পুরোনো।

ছেচল্লিশ বছর আগে, এক মহালয়ার ভোরে, হাওড়া স্টেশনের ভিড়ের মধ্যে একজন বয়স্ক মানুষ মাসখানেকের একটি মেয়েকে পুনে থেকে আসা এক নিঃসন্তান দম্পতির কোলে তুলে দিয়েছিলেন। সঙ্গে দিয়েছিলেন একটা ছোট টিনের কৌটো। নিজের নাম বলেননি। শুধু বলেছিলেন, তিনি রূপবাণীর মেশিনঘরে কাজ করেন।

সেই মেয়েটি আমি।

কৌটোটা এখন আমার কাঁধের ঝোলায়। দুধের গুঁড়োর পুরোনো কৌটো, গায়ের লেবেল কবেই উঠে গেছে, ঢাকনায় মরচের গোল দাগ। ভেতরে তুলোয় মোড়া পঁয়ত্রিশ মিলিমিটার ফিল্মের একটিমাত্র ফ্রেম। হলদেটে, কিনারার ফুটোগুলো একদিকে ছেঁড়া। আলোর দিকে তুলে ধরলে একজন রোগা, লম্বাটে মুখের মানুষকে দেখা যায়। চোখে অদ্ভুত একটা অসহায় হাসি, যেন কেউ তাঁকে বকেছে আর তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না কেন।

মুখটা চিনতে আমার বারো বছর লেগেছিল। কানু বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে যিনি 'পথের পাঁচালী'-তে হরিহর হবেন, দুর্গার বাবা। কিন্তু এই ফ্রেম তার অনেক আগের। আর্কাইভের এক পুরোনো প্রচার পুস্তিকার স্থিরচিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হয়েছিলাম, এটা ১৯৩৭ সালের 'শশীনাথ' ছবির। ছবিটা মুক্তি পেয়েছিল ১৪ আগস্ট, রূপবাণীতেই। আমি অন্তত তার কোনো প্রিন্টের খোঁজ কোথাও পাইনি। পৃথিবীতে 'শশীনাথ'-এর যতটুকু আমি নিজের চোখে দেখেছি, তা এই একটি ফ্রেম।

একটা হারিয়ে যাওয়া ছবির শেষ চিহ্ন, আর একটা হারিয়ে যাওয়া মেয়ের প্রথম চিহ্ন। দুটোই একই কৌটোয়।

কৌটোটা আমি পেয়েছিলাম আঠারো বছর বয়সে, যেদিন মা আমাকে সত্যিটা বলেছিলেন। মা মানে সুনন্দা বসু, যিনি আমাকে মানুষ করেছেন। বাগবাজারের মেয়ে, বিয়ে হয়ে পুনেতে গিয়েছিলেন। বাবা সেখানে একটা ছবি পরিবেশক সংস্থায় কাজ করতেন। আমার ফিল্মের নেশা বাবার কাছ থেকেই পাওয়া, অনেকে বলে। আমি জানি, নেশাটা আসলে ওই কৌটোর কাছ থেকে।

বাবা চলে গেছেন এগারো বছর আগে। মা গেলেন এ বছর শ্রাবণে, হাসপাতালের সাদা চাদরের ওপর, এক বৃষ্টির রাতে। যাওয়ার দু'দিন আগে আমার হাত ধরে বলেছিলেন, 'মহালয়ার দিন বাগবাজারের ঘাটে আমাকে একটু জল দিস। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ওই ঘাটে তর্পণ দেখতে যেতাম।'

আমি বলেছিলাম, 'মেয়েরা তো তর্পণ করে না, মা।'

মা হেসেছিলেন, সেই শেষ হাসিগুলোর একটা। 'ধুর পাগলি। তুই আমার কথা শুনবি না ওদের।'

তারপর, অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে, প্রায় ফিসফিস করে আরেকটা কথা বলেছিলেন, যা আঠারো বছর বয়সে বলেননি, আঠাশ বছর ধরে বলেননি। 'লোকটা বলেছিল, রূপবাণীর মেশিনঘরে কাজ করে। এতদিন বলিনি, ভয়ে। তুই যদি চলে যাস। এখন আর ভয় নেই। খুঁজিস।'

তাই আমি মহালয়ার পাঁচ দিন আগে কলকাতায় এসেছি। নিজেকে বুঝিয়েছি, এসেছি মায়ের তর্পণ করতে। কথাটা অর্ধেক সত্যি। বাকি অর্ধেক আমার কাঁধের ঝোলায়, তুলোয় মোড়া।


পুজোর দু'সপ্তাহ আগের হাতিবাগান যিনি দেখেননি, তাঁকে বোঝানো শক্ত। বিধান সরণীর দু'ধারের ফুটপাত বলে আর কিছু নেই, আছে শাড়ি, কুর্তি, ঝুটো গয়না, প্লাস্টিকের চুলের ক্লিপ, আর তার ফাঁকে ফাঁকে মানুষ। হকারদের গলা, রিকশার হর্ন, বাসের কন্ডাক্টরের হাঁক, সব মিলে এমন একটা শব্দপিণ্ড তৈরি হয় যার ভেতরে নিজের চিন্তাও শোনা যায় না। ভিড় ঠেলে হাতিবাগান মার্কেটের সামনে দিয়ে গেলাম। ২০১২ সালের আগুনে এর বেশির ভাগটা পুড়ে গিয়েছিল, এখন দেখে বোঝার উপায় নেই। গলির মুখে হাতিবাগান সর্বজনীন আর নবীন পল্লীর মণ্ডপের বাঁশের কাঠামো উঠেছে, তাতে কাপড় পড়েনি এখনও। কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে, মাংস লাগার অপেক্ষায়।

স্টার থিয়েটারের সামনে খানিক দাঁড়ালাম। পুরোনো সামনের দিকটা যত্ন করে রাখা হয়েছে, ভেতরটা নতুন। বিনোদিনীর নামের বোর্ড, গিরিশ ঘোষের স্মৃতি, তার নিচে এ সপ্তাহের ছবির পোস্টার। এই হলটা অন্তত টিকে আছে। মিত্রা টেকেনি। যে হল আগে ছিল 'চিত্রা', যেখানে 'নটীর পূজা' মুক্তি পেয়েছিল, ১৯৩১ থেকে যার পর্দায় আলো জ্বলেছে, ২০১৯ সালের পয়লা এপ্রিল তার শেষ শো হয়ে গেছে। এক কিলোমিটারের এই রাস্তায় একসময় উত্তরা, শ্রী, রূপবাণী, রাধা, পূর্ণশ্রী, মিনার, দর্পণা, পরপর এতগুলো হল ছিল। আমি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নামগুলো মনে মনে আওড়ালাম, শ্রাদ্ধবাসরে মৃতের নামের মতো।

পানের দোকানের বুড়োর নাম বিশু। লোকে বিশুদা বলে, বয়স আশির কাছাকাছি, গলায় তুলসীর মালা, দাঁতে পানের ছোপ। দোকানটা তাঁর বাবার আমলের। রূপবাণীর কথা জিজ্ঞেস করতেই ওনার চোখ দুটো একটু অন্যরকম হয়ে গেল।

'রূপবাণী? সে কি আজকের কথা দিদি। ওই যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, তার উল্টোদিকে। রোববার ম্যাটিনিতে লাইন পড়ত এই অবধি।' হাত দিয়ে তিনি যে অবধি দেখালেন, তাতে লাইনটা আমার পায়ের কাছে এসে থামে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, হলের পুরোনো কর্মচারীদের কাউকে তিনি চেনেন কি না। বিশেষ করে মেশিনঘরের কাউকে।

'অপারেটর? নিবারণ অপারেটরের কথা বলছেন?' বিশুদা চুন লাগানো আঙুলটা মুছলেন। 'নিবারণ ঘোষ। রূপবাণীর হেড অপারেটর ছিলেন। পনেরো বছর বয়সে রিল গোটানোর ছোকরা হয়ে ঢুকেছিলেন, শুনেছি। রবিঠাকুরকে নিজের চোখে দেখেছেন, এই গপ্পো সারা জীবন করে গেছেন। মারা গেছেন সে অনেক কাল, নব্বইয়ের মাঝামাঝি হবে।'

আমার বুকের ভেতর কিছু একটা খুব জোরে একবার ধাক্কা দিল। গলাটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে জিজ্ঞেস করলাম, 'ওঁর বাড়ির কেউ আছেন?'

'মেয়ে আছে। সরযূদি। সিমলেয় থাকে, বাপের ভিটেতে। বিয়ে হয়েছিল, টেকেনি, বাপের কাছে ফিরে এসেছিল। ছেলেপুলে নেই।' বিশুদা একটা পান মুড়তে মুড়তে বললেন, 'কাল একাদশী তো। কাল সকালে ধামে গেলেই পাবেন। লুচি ভোগের সময় সরযূদি যাবেই। চল্লিশ বছর এক দিনও কামাই নেই।'

'ধাম?'

বিশুদা একটু অবাক হয়ে তাকালেন, যেন কলকাতায় এসে কেউ ধামের নাম জানে না, এটা তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য। 'কাত্যায়নী ধাম গো। স্বামীজির বাড়ির উল্টোদিকের গলি। বাঁড়ুজ্জেদের ঠাকুর। খুব জাগ্রত।'

সে রাতে হেদুয়ার কাছে গেস্ট হাউসের ছোট ঘরে বসে কৌটোটা খুললাম। ফ্রেমটা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় তুলে ধরলাম, যেমন হাজারবার ধরেছি। কানু বন্দ্যোপাধ্যায় তাকিয়ে রইলেন সেই অসহায় হাসি নিয়ে। ছেচল্লিশ বছরে প্রথমবার মনে হলো, এই হাসিটা আসলে প্রশ্ন। আর আমি প্রশ্নটা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি, অন্য কারও কাছে পৌঁছে দেব বলে।

ঘুম এলো অনেক রাতে। স্বপ্নে দেখলাম, একটা অন্ধকার হলঘরের পেছনের দেয়ালে একটা ছোট্ট চৌকো ফোকর, তার ভেতর দিয়ে আলোর একটা সরু রেখা বেরিয়ে আসছে। রেখাটা কোথাও পৌঁছোচ্ছে না। সামনে কোনো পর্দা নেই।

দুই

বড় বড় হাতে জবার রেকাবি ধরা বৃদ্ধা, পাশে মৃন্ময়ী, পেছনে দশভুজা।
“যুদ্ধের হাতের চেয়ে কোলের হাত বড় হবে না?”

মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর। ইন্দিরা একাদশী।

বিধান সরণী ধরে দক্ষিণে হাঁটলে স্বামী বিবেকানন্দের পৈতৃক বাড়ি পড়ে। সংস্কার করা পুরোনো বাড়ি, সামনে স্কুলের বাচ্চাদের একটা দল, এক মাস্টারমশাই তাদের লাইন করে দাঁড় করাচ্ছেন। নরেন্দ্রনাথ দত্ত এই বাড়িতে জন্মেছিলেন, এখানেই তাঁর ছেলেবেলা কেটেছে, এ কথা সবাই জানে। যা অনেকে জানে না, তা হলো রাস্তার ঠিক উল্টোদিকের সরু গলিটার ভেতরে আরেক দেবী থাকেন। তিনি এসেছেন অনেক দূর থেকে, অনেক জল পেরিয়ে।

৭ রেভারেন্ড কালী ব্যানার্জী লেন। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের পুরোনো বাড়ি। এ বাড়ির নাম কাত্যায়নী ধাম।

একাদশীর সকালে বাড়ির ভেতর থেকে ঘিয়ের গন্ধ আসছিল। লুচি ভাজার গন্ধ চিনতে বাঙালির নাক কখনো ভুল করে না, প্রবাসী বাঙালিরও না। আমি গেটের বাইরে একটু ইতস্তত করছিলাম। একটা অচেনা পরিবারের ঠাকুরঘরে হুট করে ঢুকে পড়া যায় না।

ঠিক তখনই একজন বৃদ্ধা গলির মুখ দিয়ে ঢুকলেন।

ছোটখাটো চেহারা, পিঠটা সামান্য বাঁকা, পরনে সরু পাড়ের সাদা খোলের শাড়ি। চুল পুরো সাদা, পেছনে একটা ছোট খোঁপা। হাতে একটা কাঁসার ছোট রেকাবি, তাতে কয়েকটা জবা আর একমুঠো দূর্বা, ওপরে একটা ভিজে গামছা চাপা। হাঁটার ধরনে একটা তাড়া আছে, যেন দেরি হয়ে গেলে কেউ রাগ করবে।

কিন্তু আমার চোখ আটকে গেল তাঁর হাত দুটোয়।

ওরকম হাত আমি আগে একজনেরই দেখেছি। শরীরের মাপে অস্বাভাবিক বড়, আঙুলগুলো লম্বা, গাঁটগুলো উঁচু, তালু চওড়া। যেন অন্য কারও হাত কেউ ভুল করে এই ছোট্ট মানুষটির কবজিতে জুড়ে দিয়েছে।

তিনি আমার দিকে তাকালেন, তারপর আমার কাঁধের ঝোলার দিকে, তারপর আবার আমার মুখের দিকে। 'ঠাকুর দেখতে এসেছ?'

'হ্যাঁ। আসলে... আমি একটু খোঁজখবর করছি। পুরোনো কলকাতা নিয়ে কাজ।'

'এসো।' তিনি গেট ঠেলে ঢুকলেন, আমি পেছন পেছন। যেন এ বাড়ি তাঁর নিজের।

পরে জেনেছিলাম, এ বাড়ি তাঁর নিজের নয়। কিন্তু চল্লিশ বছর ধরে প্রতিটি একাদশীর সকালে যিনি এই দরজা দিয়ে ঢোকেন, বাড়ির লোকেরা তাঁকে আর বাইরের লোক ভাবে না।


ঠাকুরঘরে ঢুকে আমি থমকে দাঁড়ালাম।

সিংহাসনে মহাদেব আর রাধামাধবের পাশে বসে আছেন দশভুজা। অষ্টধাতুর বিগ্রহ, খুব বড় নয়, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি ঘরের প্রতিটি কোণ ভরে রেখেছে। দশটি হাতে দশ রকম অস্ত্র, পায়ের কাছে মহিষাসুর। মাথার ওপরে ছোট্ট একটি বৃষবাহন শিব, যেন মেয়ের যুদ্ধ দেখতে বাবা ওপরে এসে বসেছেন। আর দেবীর বাহন সিংহটির মুখ অদ্ভুত, প্রায় ঘোড়ার মুখের মতো লম্বাটে। এমন সিংহ আমি আগে দেখিনি। মনে হলো কোনো প্রাচীন শিল্পী সিংহ কখনো চোখে দেখেননি, শুধু গল্প শুনে গড়েছেন, আর সেই না দেখার মধ্যেই একটা আশ্চর্য সত্য ধরা পড়েছে।

কিন্তু সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে দেবীর হাত। দশটি হাতের মধ্যে সামনের দুটি অন্যগুলোর তুলনায় বড়।

বৃদ্ধা আমার পাশে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বললেন, 'দেখেছ? সামনের দুটো হাত বড়। কুমোরটুলির ঢাকেশ্বরী মায়েরও তাই। একই কারিগরের হাতের কাজ, এ বাড়ির লোকেরা বলে। ঢাকেশ্বরী একটু ছোট, ইনি একটু বড়।'

'কেন বড়?'

তিনি একটু হাসলেন। 'শাস্ত্রে কী আছে জানি না, বাপু। আমি মুখ্যু মানুষ। আমার মনে হয়, সামনের হাত দুটো দিয়ে মা কোলের ছেলেমেয়েকে ধরেন। বাকি আটটা হাতে যুদ্ধ। যুদ্ধের হাতের চেয়ে কোলের হাত বড় হবে না?'

আমি কিছু বললাম না। আমার নিজের হাত দুটো তখন ঝোলার স্ট্র্যাপ আঁকড়ে আছে।

ভোগ দেওয়া হলো। কাঁসার থালায় গরম লুচি, ফুলে ওঠা, সোনালি। একাদশীতে দেবীর লুচি ভোগ। পুরোহিতমশাই আরতি করলেন, ঘণ্টার শব্দে ঘরটা কেঁপে উঠল। বৃদ্ধা দুহাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন, চোখ বন্ধ, ঠোঁট নড়ছে। আমি তাঁর ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো ধরার চেষ্টা করলাম, পারলাম না। শুধু মনে হলো, এটা কোনো মন্ত্র নয়। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, যেমন রোজ বলেন।

আরতির পর বারান্দার এক কোণে বসে তিনি আমাকে দেবীর গল্প বললেন। পরে বইপত্র ঘেঁটে দেখেছি, এক বর্ণও ভুল বলেননি। শুধু বইয়ের ভাষা আর তাঁর ভাষায় তফাত ছিল। বই তো শুধু তথ্য দেয়। ওনার কথায় আত্মীয়তা ছিল।

'মা এসেছেন পুব বাংলা থেকে। বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গাঁ। অতীশ দীপঙ্করের গাঁ, শুনেছ তো? সেখানে এঁদের পূর্বপুরুষের মামার বাড়িতে মায়ের পুজো হতো। তখন এঁদের পদবি ছিল চৌধুরী। পরে মায়ের ভার এলো বাঁড়ুজ্জেদের হাতে। সেই থেকে মা এঁদের।'

তিনি একটু থামলেন। 'শোনা যায়, রঘু ডাকাত নাকি এঁর সামনে নরবলি দিয়েছিল।'

কথাটা তিনি এমনভাবে বললেন, যেন পাড়ার কোনো পুরোনো কেলেঙ্কারির কথা বলছেন। ভয়ের কিছু নেই, আবার উড়িয়ে দেওয়ারও কিছু নেই।

'তারপর?'

'তারপর একদিন কোন এক পাষণ্ড মাকে তুলে নিয়ে গিয়ে পুকুরে ফেলে দিল।' তাঁর গলার স্বরটা একটু চেপে এলো। 'মা জলের তলায় পড়ে রইলেন। কতদিন, কেউ জানে না। তারপর একজন স্বপ্ন পেলেন। মা বললেন, আমি জলে আছি, তুলে আন। পুকুরে জাল ফেলা হলো। জালে মা উঠলেন।'

'শুধু মা?'

তিনি আমার দিকে তাকালেন। চোখে একটা অদ্ভুত দৃষ্টি, যেন বুঝতে পারছেন না আমি প্রশ্নটা কেন করলাম। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, 'শুধু মা। মায়ের সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ছিল। তাদের আর পাওয়া যায়নি। জাল যতবার ফেলো, শুধু মা ওঠেন। ছেলেমেয়েরা জলেই রয়ে গেল।'

বারান্দার নিচে উঠোনে একটা চড়ুই কিচকিচ করে উড়ে গেল। আমি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলাম না।

তিনি আবার শুরু করলেন, যেন গল্পের সুতো ছিঁড়তে দেবেন না। মায়ের পরের গল্পটা শোনো এবার। এ পরিবারের নামকরা চিকিৎসক ছিলেন চিন্তাহরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনি দেশের বাড়িতে ঠাকুরদালান গড়ে দিয়েছিলেন, তখন মায়ের খুব সেবাযত্ন হতো। তারপর দেশভাগ। মাকে পাঠানো হলো বেনারসে, আত্মীয়দের কাছে। সেখানে দেখাশোনা ঠিকমতো হতো না। ১৯৮০ সালে মা এলেন কলকাতায়, চিন্তাহরণবাবুর নাতির বাড়িতে, এই বাড়িতে।

'আশি সালে,' আমি আস্তে বললাম।

'হ্যাঁ! আশি সালে।' তিনি মাথা নাড়লেন, আর তাঁর মুখের ওপর দিয়ে একটা ছায়া চলে গেল, যেন এই সালটার সঙ্গে তাঁর নিজের কোনো হিসেব আছে। 'তারপর ছিয়াশি সালে আবার স্বপ্নাদেশ। মা বললেন, আমার পুজো কর। সেই থেকে এ বাড়িতে ধুমধাম করে দুর্গাপুজো। বাড়ির নাম হলো কাত্যায়নী ধাম।'

'আর লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ?'

এবার তিনি একটু হাসলেন। হাসিটা গর্বের, যেন মায়ের কোনো জেদের কথা বলছেন যে জেদ তাঁর নিজেরও। 'বাড়ির লোকেরা ঠিক করেছিল পেতলের লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ গড়িয়ে মায়ের পাশে বসাবে। মা স্বপ্নে বারণ করলেন। বললেন, না।'

'কেন?'

'সেটা মা ই জানেন।' বৃদ্ধা উঠোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। 'আমার মনে হয়, মা বলতে চেয়েছিলেন, যারা জলে গেছে তারা আমার। পেতলের পুতুল দিয়ে আমাকে ভোলাবি? আমি ভুলব না।'


আমি বৃদ্ধাকে ঠিক বোঝাতে পারব না, সেদিন সকালে এই কথাগুলো আমার কাছে কী ছিল। তিনি দেবীর গল্প বলছিলেন। আমি শুনছিলাম অন্য কিছু।

পরে, গেস্ট হাউসে ফিরে, ল্যাপটপে বইপত্র ঘাঁটলাম। আর্কাইভের লোকের এটাই অভ্যাস। কোনো কিছু বুকে লাগলে আগে সূত্র খোঁজা, তারপর কান্না। কাত্যায়নী দেবী দুর্গার একটি রূপ, নবদুর্গার ষষ্ঠ। নবরাত্রির ষষ্ঠ দিনে এই যুদ্ধদেবীর পুজো হয়। তাঁর প্রথম উল্লেখ তৈত্তিরীয় আরণ্যকে। পতঞ্জলির মহাভাষ্যে তাঁকে বলা হয়েছে মহাশক্তির আদিরূপ। পুরাণমতে মহিষাসুর বধের জন্য তাঁর সৃষ্টি। তন্ত্রসারে তিনি দশভুজা মহিষমর্দিনী, হরিবংশে অষ্টাদশভুজা। ভাগবত পুরাণের দশম স্কন্ধে আরেক কাত্যায়নী। বৃন্দাবনের গোপকুমারীরা মার্গশীর্ষ মাসে ভোরবেলা যমুনায় স্নান করে, নদীর পাড়ের বালি দিয়ে দেবীর মূর্তি গড়ে পুজো করত আর প্রার্থনা করত,

কাত্যায়নি মহামায়ে মহাযোগিন্যধীশ্বরি। নন্দগোপসুতং দেবি পতিং মে কুরু তে নমঃ॥

যে দেবী মহিষাসুরের বুকে ত্রিশূল গাঁথেন, তাঁর কাছেই কিশোরী মেয়েরা মনের মানুষ চায়। এই দুটো মুখ একই দেবীর, ভাবতে অদ্ভুত লাগে। তারপর মনে হয়, এতে অদ্ভুতের কিছু নেই। যিনি ভালোবাসতে জানেন, লড়তেও তিনিই জানেন।

কিন্তু যে কথাটা আমাকে সারা রাত জাগিয়ে রাখল, সেটা তাঁর নামের উৎস নিয়ে। দুটো গল্প আছে। কালিকা পুরাণ বলে, ঋষি কাত্যায়ন প্রথম তাঁর পুজো করেছিলেন, তাই তিনি কাত্যায়নী। আরেকটা মত বলে, তিনি ঋষি কাত্যায়নের কন্যা হয়ে জন্মেছিলেন, তাই কাত্যায়নী। পণ্ডিতেরা কোনটা ঠিক তা নিয়ে তর্ক করেন। আমি রাত দুটোয় গেস্ট হাউসের অন্ধকার ঘরে শুয়ে ভাবছিলাম, দুটোই ঠিক হতে পারে না কেন। একজন জন্ম দেন। আরেকজন প্রথম পুজো করেন, প্রথম যত্নে তুলে নেন, প্রথম নাম দেন। একই মেয়ের দুই উৎস। দুটো গল্পই সত্যি।

তন্ত্রে নাকি কাত্যায়নী আজ্ঞাচক্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। দুই ভুরুর ঠিক মাঝখানের বিন্দুটি। সাধক সেখানে মন স্থির করলে দেবীর আশীর্বাদ পান।

আমি অন্ধকারে আঙুল তুলে নিজের দুই ভুরুর মাঝখানটা ছুঁলাম। রোজকার টিপটা খুলে রাখা আছে বেসিনের আয়নায়। আঙুলের ডগায় চেনা ছোট্ট উঁচু জায়গাটা লাগল। হাত নামিয়ে নিলাম। কিছু ভাবতে ইচ্ছা করছিল না।


বৃদ্ধার নাম জেনেছিলাম সেদিন সকালেই, বিদায় নেওয়ার আগে। আমি যখন বললাম পুরোনো সিনেমা হল নিয়ে কাজ করছি, রূপবাণী নিয়ে, তিনি এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন যেন আমি তাঁর হারানো কোনো জিনিসের নাম উচ্চারণ করেছি।

'রূপবাণী? আমার বাবা রূপবাণীর মেশিনঘরে কাজ করতেন গো। হেড অপারেটর। নিবারণ ঘোষ।' তারপর একটু থেমে, খানিকটা লাজুক গলায়, 'আমি সরযূ। সরযূবালা। বাবার খাতাপত্তর সব আছে আমার কাছে। দেখবে? কাল বিকেলে এসো।'

আমি বললাম, আসব।

গলি দিয়ে বেরোনোর সময় একবার পেছন ফিরে তাকালাম। তিনি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন, রেকাবিটা বুকের কাছে ধরা। বড় বড় হাত দুটো রেকাবির কিনারা জড়িয়ে আছে, যেমন করে মানুষ কোনো ঘুমন্ত শিশুকে ধরে।

তিন

সরযূবালা ঘোষের বাড়িটা ধামের পাশের গলিতেই, আরও সরু এক গলির শেষ মাথায়। একতলা পুরোনো বাড়ি, দেওয়ালের চুন খসে লাল ইট বেরিয়ে পড়েছে, জানলার খড়খড়ির দুটো পাখি ভাঙা। ভেতরে দুটো ঘর, একফালি উঠোন, উঠোনের মাঝখানে একটা ইটের বেদিতে তুলসীগাছ। বুধবারের বিকেলের রোদ উঠোনে তেরছা হয়ে পড়েছিল, আর সেই রোদে কয়েকটা শাড়ি শুকোচ্ছিল, সবই সাদা।

তিনি আমাকে বসালেন ভেতরের ঘরে। একটা তক্তপোশ, একটা আলমারি, দেওয়ালে কয়েকটা ঠাকুরের ছবি, আর একটা ফ্রেমে বাঁধানো সাদাকালো ফোটোগ্রাফ। ফটোতে এক তরুণ, রোগা, চুল তেল দিয়ে পেছনে আঁচড়ানো, একটা প্রকাণ্ড লোহার যন্ত্রের পাশে দাঁড়িয়ে হাসছেন। যন্ত্রটা আমি দেখেই চিনলাম। পুরোনো আমলের প্রজেক্টর, কার্বন-আর্কের বাতিঘর সমেত। আমাদের আর্কাইভের জাদুঘরে ওরকম একটা আছে।

'বাবা,' সরযূ বললেন। 'রূপবাণীর মেশিনঘরে। তখন বয়স কুড়ি বাইশ হবে।'

আলমারির মাথায় একটা রেডিও। কাঠের খোল, সামনে কাপড়ের জালি, দুটো গোল নব। ভালভের রেডিও, এখন আর এমন জিনিস কেউ চোখে দেখে না।

'এটা চলে?'

'চলে। বছরে একদিন চালাই।' তিনি একটু থামলেন। 'মহালয়ার দিন।'

চা এলো, সঙ্গে দুটো নারকোল নাড়ু। তারপর তিনি আলমারির নিচের তাক থেকে একটা টিনের তোরঙ্গ টেনে বের করলেন। ডালা খুলতেই পুরোনো কাগজ আর ন্যাপথলিনের গন্ধ। ভেতরে কয়েকটা মোটা বাঁধানো খাতা, লাল কাপড়ের মলাট, কোণগুলো পোকায় খাওয়া।

'বাবার খাতা। সারা জীবন লিখেছেন। কোন ছবি কবে এলো, কে এলো, কী হলো। বাবা বলতেন, ছবি হারিয়ে যায় রে, খাতা থেকে যায়।'

আমি খাতাটা হাতে নিলাম, আর্কাইভে যেমন করে নিই, দু'হাতের তালুর ওপর রেখে, যাতে বাঁধাইয়ে চাপ না পড়ে। সরযূ লক্ষ করলেন। কিছু বললেন না, শুধু চোখে একটা প্রশ্রয়ের ভাব এলো।


নিবারণ ঘোষের হাতের লেখা মুক্তোর মতো। কালি কোথাও কোথাও ফিকে, কিন্তু অক্ষরগুলো সোজা, পরিষ্কার, সাধুভাষায় লেখা। প্রথম পাতায় লেখা:

আমার জন্ম বাংলা ১৩২৯ সালে। সেই বৎসর, ইংরাজি ১৯২২ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর, মনোমোহন থিয়েটারে 'আঁধারে আলো' মুক্তি পায়। বাবা বলিতেন, ইহাই বাংলা গল্পের ছবির শুরু। হেমেন্দ্রকুমার রায় মহাশয় পরে লিখিয়াছেন, অন্য ছবিওয়ালারা যখন সস্তায় বাজিমাত করিবার ফিকিরে ঘুরিতেছিলেন, শিশিরকুমার ভাদুড়ী তখন সোজা পথে গিয়া শরৎচন্দ্রের দ্বারে ধরনা দেন, এবং প্রথমেই 'আঁধারে আলো' গল্পটি বাছিয়া লন। আমি আঁধারে জন্মাইয়াছি, আলো দেখাইয়া খাই। ইহা বিধাতার রসিকতা।

আমি না হেসে পারলাম না। সরযূও হাসলেন। 'বাবা এরকমই ছিলেন। সব কথায় একটা ফোড়ন।'

পরের পাতাগুলোয় বাংলা সিনেমার শৈশব, একজন প্রজেকশনিস্টের চোখে। নিবারণবাবু বেশির ভাগটাই নিজে দেখেননি, বড়দের মুখে শুনে লিখেছেন, আর সেটা সততার সঙ্গে লিখেও রেখেছেন:

শুনিয়াছি, ১৯২৯ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর শরৎবাবুর 'চরিত্রহীন'-এর মহরত হয়। শরৎবাবু স্বয়ং বিশিষ্ট অতিথি হইয়া স্টুডিওতে উপস্থিত ছিলেন। ছবি মুক্তি পায় ১৯৩১ সালের ৯ই মে, ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন ফিল্মস লিমিটেডের প্রযোজনায়, দশ রিলের ছবি। আশ্চর্য এই, 'আঁধারে আলো' এবং 'চরিত্রহীন' দুইয়েরই শুভারম্ভ ২০শে সেপ্টেম্বর। শরৎবাবুর গল্পের ছবির জন্য বোধহয় ঐ তারিখটি বাঁধা।

তারপর একটা পাতায় লেখাটা হঠাৎ বদলে গেছে। অক্ষরগুলো একটু বড়, একটু কাঁপা, যেন উত্তেজনায় লেখা, যদিও তারিখ বলছে লেখা হয়েছে অনেক পরে, স্মৃতি থেকে:

১৯৩২ সালের ১৯শে ডিসেম্বর। আমার বয়স দশ। হাতিবাগানের কাছে স্ক্রিন কর্পোরেশন লিমিটেডের নূতন চিত্রগৃহের উদ্বোধন। কবি আসিবেন শুনিয়া পাড়ার সকল ছেলে ভিড় করিয়াছিল। আমি পুলিশের পায়ের ফাঁক গলিয়া সম্মুখে গিয়াছিলাম। কবিকে দেখিলাম। সাদা দাড়ি, সাদা জোব্বা, চক্ষু দুইটি যেন বহুদূরে কিছু দেখিতেছে। তিনিই হলের নাম দিলেন রূপবাণী। বাবা পরে বুঝাইয়া দিয়াছিলেন, রূপ অর্থে ছবি, বাণী অর্থে কথা। আমি ভাবিয়াছিলাম, রূপ অর্থে সুন্দর মুখ, বাণী অর্থে মায়ের ডাক। দশ বৎসরের বালকের ব্যাখ্যা। কিন্তু আজও মনে হয়, ভুল বুঝি নাই।

পাশের মার্জিনে, পেনসিলে, ছোট করে আরেকটা কথা:

ইহার কিছু পূর্বে কবি নিউ থিয়েটার্সে 'নটীর পূজা' ছবি করিয়াছিলেন। কবির বসিবার জন্য সেখানে গোলাঘর তৈরি হইয়াছিল, শুনিয়াছি সে ঘর আজও আছে। ছবির কাজ শেষ হইলে প্রিন্ট দেখিয়া কবি বলিয়াছিলেন, 'এই ছবি আমি করেছি? না আর ছবিতে ডিরেকশন দেওয়া নয়।' কবির মুখে এমন হারমানা কথা আর কখনো শুনি নাই।

সরযূ খাতার ওপর ঝুঁকে পড়ে বললেন, 'এই পাতাটা বাবার সবচেয়ে প্রিয় ছিল। রোজ রাতে খুলে পড়তেন।' তিনি আঙুল দিয়ে পাতা উল্টে দিলেন।

১৯৩৭ সালের ১৪ই আগস্ট। রূপবাণীতে 'শশীনাথ' মুক্তি পাইল। আমি পনেরো বৎসর বয়সে এই মাসেই মেশিনঘরে রিল গুটাইবার কাজ পাইয়াছি। ছবি চলাকালীন একদিন কবি আসিয়া ছবি দেখিলেন। ছবি শেষে অভিনেতা কানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকিয়া বলিলেন, 'তোমার অভিনয় দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম। তোমার স্ত্রীর অভিনয়ও আমি উপভোগ করেছিলাম।' ম্যানেজারবাবু কথাগুলি মেশিনঘরে আসিয়া আমাদের শুনাইলেন। আমি সেদিন রিল গুটাইতে গুটাইতে কাঁদিয়াছিলাম, কেন জানি না।

আমার হাতের তালুতে খাতাটা একটু কেঁপে উঠল। সরযূ টের পেলেন না, তিনি তখন পরের পাতা খুঁজছেন।

'শশীনাথ,' আমি বললাম। গলাটা নিজের কানেই অচেনা লাগল।

'হ্যাঁ। বাবার প্রথম ছবি। সারা জীবন ওই ছবির কথা বলতেন। কানুবাবুকে পরে "পথের পাঁচালী"-তে হরিহর হতে দেখে বাবা হলের অন্ধকারে বসে হাউহাউ করে কেঁদেছিলেন। মা বলত, লোকে ভাবল বুড়ো পাগল হয়ে গেছে। হরিহর যখন মেয়ের জন্য শাড়ি নিয়ে ঘরে ফেরে, আর মেয়েটা তখন আর নেই...' সরযূ থেমে গেলেন। চোখ সরিয়ে নিলেন জানলার দিকে। 'ওই জায়গাটা বাবা সইতে পারতেন না।'

আমি কিছু বললাম না।

পরের পাতাগুলোয় আরও কথা। ১৯৩৭ সালের শেষে পরিচালক নরেশ মিত্র শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন কবিকে 'গোরা'-র নাট্যরূপ পড়ে শোনাতে, আর 'কঙ্কাল' গল্পটা নিয়ে ছবি করার ইচ্ছে জানিয়েছিলেন। কবি তাঁকে সিনেমার জন্যই কাহিনি তৈরি করতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। নিবারণবাবু লিখেছেন, ‘জীবিতকালে সিনেমাজগতের সহিত কবির ইহাই বোধহয় শেষ আলাপ।‘

আর অনেক পরের একটা পাতায় একটা হলদে হয়ে আসা খবরের কাগজের কাটিং আঠা দিয়ে সাঁটা। ১৯৭৬ সালের 'চিত্রজগৎ' পত্রিকা, অরুণকুমার রায়ের লেখা। তাতে বলা হচ্ছে, 'নটীর পূজা'-র অভিজ্ঞতার পর রবীন্দ্রনাথ নিজের কাহিনির চিত্ররূপদাতাদের আর আগের মতো জোর গলায় সমালোচনা করতে পারেননি, বুঝেছিলেন, চলচ্চিত্র একটা আলাদা মাধ্যম, তার চরিত্র আলাদা, ধর্ম আলাদা। কাটিংয়ের নিচে নিবারণবাবুর হাতে এক লাইন:

এ বৎসর মহালয়া শুনি নাই। রেডিওতে বীরেনবাবুর বদলে উত্তমকুমার। বেচারা উত্তম, তাহার দোষ নাই। কিন্তু কিছু জিনিস বদলাইতে নাই। মানুষ বদলায়, মা বদলায় না।

'মানুষ বদলায়, মা বদলায় না,' আমি জোরে পড়লাম।

সরযূ মাথা নাড়লেন। 'ছিয়াত্তর সালের মহালয়ায় রেডিওতে অন্য অনুষ্ঠান দিয়েছিল, জানো তো? উত্তমকুমারকে দিয়ে। পাড়াসুদ্ধ লোক রেগে আগুন। বাবা সে বছর রেডিও খোলেননি। বললেন, বীরেনের গলা ছাড়া মা আসেন না।'


খাতার শেষ দিকটা আমি দেখতে চাইছিলাম। সত্তর দশক পেরিয়ে আশি। কিন্তু সরযূ খাতাটা আলতো করে আমার হাত থেকে নিয়ে বন্ধ করে দিলেন।

'শেষের দিকে আর বিশেষ কিছু নেই। বাবা পরে লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন।'

তাঁর গলায় কোনো রুক্ষতা ছিল না। কিন্তু একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম। চাপ দিলাম না। আর্কাইভে বাইশ বছরে একটা জিনিস শিখেছি, কিছু রিল জোর করে খুললে ছিঁড়ে যায়। তাদের সময় দিতে হয়, ঘরের তাপমাত্রায় ধীরে ধীরে নরম হতে দিতে হয়।

তার বদলে তিনি তোরঙ্গের তলা থেকে আরেকটা জিনিস বের করলেন। একটা পুরোনো বিস্কুটের টিন, ভেতরে সারি সারি ছোট ছোট খাম, প্রত্যেকটার গায়ে একটা ছবির নাম আর সাল লেখা।

'বাবার ফ্রেম,' সরযূ বললেন। 'রিল ছিঁড়লে জোড়া দিতে হয় তো, তখন দু-একটা ফ্রেম বাদ যায়। বাবা সেগুলো ফেলতেন না। প্রত্যেক ছবি থেকে একটা করে রেখে দিতেন। বলতেন, যেদিন কোনো ছবি হারিয়ে যাবে, তার একটা মুখ অন্তত আমার কাছে থাকবে।'

আমি খামগুলো একটা একটা করে দেখতে লাগলাম। আঙুল চলছিল যন্ত্রের মতো, আর বুকের ভেতর ঢাকের বোল।

'শশীনাথ। ১৯৩৭।'

খামটা খালি।

'ওটা খালি,' সরযূ বললেন, প্রায় অন্যমনস্কভাবে। 'বাবার সবচেয়ে প্রিয় ছবি, আর ওটাই খালি। জিজ্ঞেস করলে বাবা বলতেন, একজনকে দিয়েছি। কাকে, বলতেন না। শুধু বলতেন, যার জিনিস, তাকে দিয়েছি।'

আমার কাঁধের ঝোলাটা হঠাৎ খুব ভারী লাগল। মনে হলো তুলোয় মোড়া ওই এক ইঞ্চির টুকরোটা আমাকে মাটির দিকে টানছে।

আমি বলতে পারতাম। তখনই, সেই মুহূর্তে, কৌটোটা বের করে খামের পাশে রেখে দিতে পারতাম। বলিনি। কেন বলিনি, আজও ঠিক জানি না। হয়তো ভয়ে। হয়তো এই কারণে যে, বিশুদা বলেছিলেন সরযূর ছেলেপুলে নেই, আর আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, নিবারণ ঘোষ হাওড়া স্টেশনে কার মেয়েকে কার কোলে তুলে দিয়েছিলেন। রূপবাণীর হেড অপারেটরের কাছে পাড়ার কত লোকের কত দায় আসতে পারে। একটা সত্যি যখন খুব কাছে চলে আসে, মানুষ অনেক সময় এক পা পিছিয়ে যায়, যাতে পুরোটা দেখতে পায়।


বেরোনোর সময় সরযূ আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন। আগের দিন জিজ্ঞেস করেননি।

'মৃন্ময়ী।'

'মৃন্ময়ী।' তিনি নামটা মুখে নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করলেন, যেন স্বাদ নিচ্ছেন। 'মাটির মেয়ে। বেশ নাম রেখেছে তোমার মা।'

তারপর হঠাৎ, কিছু না ভেবেই যেন, হাত বাড়িয়ে আমার কপালের টিপটা একটু সোজা করে দিলেন। বড় বড় আঙুল, কিন্তু ছোঁয়াটা পাখির পালকের মতো হালকা। 'টিপটা একটু বেঁকে গিয়েছিল। ঠিক মাঝখানে পরবে। ভুরুর মাঝখানটা মায়ের জায়গা।'

গলিতে বেরিয়ে আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। সন্ধে নামছিল। কোথাও শাঁখ বাজল, তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা। উত্তর কলকাতার সন্ধে এভাবেই নামে, শাঁখ থেকে শাঁখে, বাড়ি থেকে বাড়িতে, যেন কেউ অন্ধকারকে একটা একটা করে ঘরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

চার

কুমোরটুলির গলিতে চোখ না-আঁকা প্রতিমার সারি, মাঝখানে মৃন্ময়ী নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে।
“তার আগে পর্যন্ত মা দেখতে পান না।”

বৃহস্পতিবার সকালে গেলাম কুমোরটুলি।

মহালয়ার দু'দিন আগের কুমোরটুলিকে কারখানা বললে কম বলা হয়। গলিগুলো এত সরু যে দুটো মানুষ পাশাপাশি হাঁটলে তৃতীয়জনকে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াতে হয়। মাথার ওপর ত্রিপল আর প্লাস্টিকের ছাউনি, তার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ে চৌকো চৌকো হয়ে। দু'পাশে চালার নিচে সারি সারি দুর্গা। কেউ এখনও খড়ের কাঠামো, দড়ি দিয়ে বাঁধা কঙ্কাল। কারও গায়ে এক মেটে লেগেছে, কারও দুই মেটে। কারও গায়ে রং চড়েছে, শাড়ি পরানো হয়েছে, গয়না উঠেছে। কিন্তু কারও চোখ নেই।

চোখ আঁকা হবে মহালয়ার দিন। চক্ষুদান। তার আগে পর্যন্ত মৃন্ময়ী মা দেখতে পান না।

একটা চালার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। একজন বুড়ো কারিগর একটা মাঝারি মাপের প্রতিমার আঙুল গড়ছিলেন। কাদামাটির ছোট ছোট টুকরো, বাঁশের চিয়াড়ি দিয়ে চেপে চেপে, মাথা নিচু করে, যেন পৃথিবীতে আর কিছু নেই। পাশে একটা ছোট্ট মেয়ে, বছর সাতেকের, বসে বসে মাটির একটা ঢেলা নিয়ে খেলছে।

'নাতনি?' জিজ্ঞেস করলাম।

তিনি মুখ না তুলেই বললেন, 'মেয়ের মেয়ে। মেয়ে থাকে বম্বেতে। পুজোয় আসবে, তবে একে আগে পাঠিয়ে দিয়েছে।' তারপর একটু থেমে, আঙুলের কাজটা শেষ করে, প্রথমবার আমার দিকে তাকালেন। 'মা তো বাপের বাড়ি আসছেন। তাই মেয়েরা সবাই আসে এই সময়। যারা যারা পারে।'


ঢাকেশ্বরীর মন্দির কুমোরটুলির ভেতরেই। মূর্তিটা ছোট, দেড় ফুটের মতো। অষ্টধাতুর, দশভুজা, সিংহবাহিনী কাত্যায়নী মহিষমর্দিনী রূপ। ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আটশো-ন'শো বছর ধরে পুজো পেয়েছেন, এমনই বিশ্বাস। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় মন্দিরের সেবায়েতরা মূর্তিটি গোপনে কলকাতায় নিয়ে আসেন, লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর সঙ্গে। প্রথম দু-তিন বছর দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরীর বাড়িতে পুজো হয়েছিল, তারপর ১৯৫০ সালে তিনি কুমোরটুলিতে এই মন্দির গড়ে দেন।

আরেকজন উদ্বাস্তু দেবী। আরেকজন জল পেরিয়ে আসা মা।

আমি মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম, সরযূ ঠিকই বলেছিলেন। দশটি হাতের মধ্যে সামনের দুটি বাকিগুলোর চেয়ে একটু বড়। একই হাতের কাজ। ঢাকেশ্বরী আর কাত্যায়নী, দুই বোনের মতো, একই কারিগরের আঙুলে জন্ম, তারপর দু'জনের দুই পথ। একজন ঢাকা থেকে সোজা কলকাতা। আরেকজন বজ্রযোগিনী থেকে পুকুরের তলা, পুকুরের তলা থেকে বেনারস, বেনারস থেকে সিমলের এক গলি।

আরেকটা তফাতও চোখে পড়ল। ঢাকেশ্বরীর সঙ্গে তাঁর ছেলেমেয়েরা আছে। লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ। কাত্যায়নী একা।

আমি নিজের হাত দুটোর দিকে তাকালাম।

ছোটবেলায় মা আমার হাত নিয়ে মজা করতেন। বলতেন, 'তোকে বানানোর সময় কারিগর বোধহয় ভুল করে অন্য কারও হাত জুড়ে দিয়েছে।' স্কুলে পিয়ানোর মাস্টারমশাই খুশি হয়েছিলেন, এক অক্টেভের বেশি ছড়ানো যায়। আর্কাইভে সহকর্মীরা বলে, আমার হাতে ছেঁড়া রিল যেভাবে জোড়া লাগে, আর কারও হাতে লাগে না। আমি কখনো ভাবিনি হাত দুটো কোথা থেকে এসেছে। মানুষ নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে না। হাত তো হাত।

মন্দিরের ঠান্ডা মেঝেতে দাঁড়িয়ে, অষ্টধাতুর দেবীর বড় বড় দুটি সামনের হাতের দিকে তাকিয়ে, আমার মনে পড়ল একটা রেকাবি, আর তার কিনারা জড়িয়ে থাকা দুটো লম্বা আঙুলের, উঁচু গাঁটের, শরীরের মাপের চেয়ে বড় হাত।


আঠারো বছর বয়সের জন্মদিনটা আমার মনে আছে। ভাদ্রের শেষ, পুনেতে তখনও বর্ষা থামেনি। রাতে খাওয়ার পর মা আমাকে নিজের ঘরে ডেকেছিলেন। বিছানার ওপর একটা টিনের কৌটো রাখা।

মা বাংলার শিক্ষিকা ছিলেন। রামায়ণের নানা দেশের নানা রূপ নিয়ে তাঁর অদ্ভুত একটা টান ছিল। সেদিন কৌটোটা খোলার আগে তিনি আমাকে একটা গল্প বলেছিলেন। থাই রামায়ণের গল্প। থাই রামায়ণে নাকি সীতা জনকের মেয়েও নন, মাটির মেয়েও নন। তিনি রাবণ আর মন্দোদরীর কন্যা। নারদের অভিশাপে লক্ষ্মীদেবী জন্ম নিয়েছিলেন রাক্ষসীর গর্ভে। জন্মের সময় জ্যোতিষী গণনা করে বললেন, এই মেয়ে রাবণের মৃত্যুর কারণ হবে। রাবণ মন্দোদরীকে আদেশ দিলেন মেয়েটিকে মেরে ফেলতে।

মা এইখানে একটু থেমে তারপর বলেছিলেন, 'মন্দোদরী রাক্ষসী হতে পারেন, কিন্তু মা তো। মা কি কখনো নিজের সন্তানকে মারতে পারে? মন্দোদরী মেয়েটিকে একটা কাঠের বাক্সে ভরে জলে ভাসিয়ে দিলেন। মিথিলার রাজা জনক বাক্সটা পেলেন, মেয়েটিকে বুকে তুলে কন্যাস্নেহে মানুষ করলেন। রাবণ এসবের বিন্দুবিসর্গ জানতে পারেনি।' মা আরও বলেছিলেন, সংঘদাসের জৈন রামায়ণেও প্রায় একই কথা আছে। সেখানেও সীতা রাবণ আর মন্দোদরীর মেয়ে। ভবিষ্যদ্বাণী ছিল এই মেয়ের জন্য লঙ্কা ধ্বংস হবে, তাই তাকে জনক রাজার ধানখেতে ফেলে আসা হয়।

তারপর মা কৌটোটা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, আমার আরেকজন মা আছেন। তিনি আমাকে জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, মন্দোদরীর মতো। তবে মারার জন্য নয়, বাঁচানোর জন্য। কেন, কী থেকে বাঁচাতে, মা জানতেন না। শুধু জানতেন, যে মানুষটা আমাকে তাঁর কোলে তুলে দিয়েছিল, তার চোখে জল ছিল, আর সে একবারও পেছন ফিরে তাকায়নি।

'ওঁকে কখনো ঘেন্না করিস না,' মা বলেছিলেন। 'আমি জনক রাজা হতে পারি। কিন্তু মন্দোদরী না থাকলে জনক রাজা কিছুই পেত না।'

আমি সেদিন কিছু বলিনি। কৌটোটা নিয়ে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিলাম। তারপর থেকে, আমি সেই অচেনা মহিলাকে ঘেন্না করেছি, মায়ের নিষেধ সত্ত্বেও। ঘেন্না করা সহজ ছিল। ঘেন্না করলে খুঁজতে হয় না।

তারপর একদিন, আর্কাইভে এক বছর কাজ করার পর, কৌটোর ফ্রেমটা প্রথমবার পেশাদার চোখে দেখলাম। আর ঘেন্নাটা কখন যে কৌতূহল হয়ে গেল, কৌতূহল কখন যে একটা জেদ, টের পাইনি। বারো বছর লেগেছিল কানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখটা চিনতে। কিন্তু কার হাত সেই মুখটা কৌটোয় রেখেছিল, তা খোঁজার সাহস পাইনি। মা বেঁচে থাকতে খুঁজলে মনে হতো তাঁকে ঠকাচ্ছি।

এখন মা নেই। এখন শুধু খোঁজার অনুমতি আছে। আর আমি সেই অনুমতি হাতে নিয়ে কুমোরটুলির এক মন্দিরে দাঁড়িয়ে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আছি, যেন হাত দুটো আমার নয়, কোনো অচেনা মানুষের।


সে রাতে, গেস্ট হাউসে, সাড়ে দশটা নাগাদ ফোনটা বাজল। অচেনা নম্বর। আগের দিন সরযূকে নম্বরটা দিয়ে এসেছিলাম, সেটা ভুলেই গিয়েছিলাম।

'মৃন্ময়ী?' গলাটা একটু দ্বিধাগ্রস্ত, যেন ফোনে কথা বলার অভ্যেস নেই। 'আমি সরযূ। এত রাতে ফোন করলাম, কিছু মনে কোরো না।'

'না না, বলুন।'

একটু চুপ। লাইনের ওপারে একটা টিকটিকি ডাকল, কিংবা পুরোনো দেওয়ালঘড়ির কোনো শব্দ। তারপর তিনি বললেন, 'কাল মহালয়ার আগের রাত। তুমি যদি... মানে, তোমার যদি অসুবিধে না থাকে... কাল রাতটা আমার কাছে থাকবে? ভোরে একসঙ্গে রেডিও শুনব।'

আমি কিছু বলার আগেই তিনি তাড়াতাড়ি বললেন, যেন কৈফিয়ত দিচ্ছেন, 'আসলে মহালয়াটা আমি একা শুনতে পারি না। অনেক বছর ধরে পারি না। বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে... না, তারও আগে থেকে। কেউ পাশে না থাকলে...' গলাটা ভেঙে গেল। 'থাক। তুমি বাইরের মানুষ, তোমাকে এসব বলা ঠিক হচ্ছে না।'

আমি জানলার বাইরে তাকালাম। হেদুয়ার গাছগুলো অন্ধকারে জমাট বেঁধে আছে। দূরে কোনো মণ্ডপে মাইক টেস্ট হচ্ছে, হ্যালো, হ্যালো, ওয়ান টু থ্রি।

'আমি আসব,' বললাম। 'বাইরের মানুষ বলে কিছু হয় না, মাসিমা।'

মাসিমা। শব্দটা মুখ থেকে বেরিয়ে আসার পর বুঝলাম, এই প্রথম তাঁকে কিছু একটা বলে ডাকলাম।

পাঁচ

রাতে ঝুলন্ত বাল্বের নিচে মুখোমুখি বসা দুজন, টুলের ওপর রেডিও।
“মরা মেয়ের মা ফিরে আসে। জ্যান্ত মেয়ের মা পালায়।”

শুক্রবার, ৯ অক্টোবর। পিতৃপক্ষের শেষ সন্ধে।

গলিতে ঢোকার মুখে দেখলাম, পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা মাইক বাঁধছে ল্যাম্পপোস্টে। একজন মই থেকে চেঁচিয়ে বলছে, 'কাল চারটের আগে চালিয়ে দিবি, বুঝলি? গতবার চারটে দশে চালিয়েছিলি, পটলাদার মা পুরো পাড়ার সামনে ঝেড়েছিল।' নিচ থেকে আরেকজন বলল, 'মোবাইলে তো সবাই শুনবে।' মইয়ের ওপর থেকে উত্তর এলো, 'মোবাইলে মহালয়া হয় না রে গাধা। মহালয়া হয় পাড়ায়।'

আমি হাসতে হাসতে সরযূর দরজায় কড়া নাড়লাম।

তিনি দরজা খুলে আমাকে দেখে এমনভাবে হাসলেন, যেন সারা বিকেল ভয় পাচ্ছিলেন আমি আসব না। উঠোনে তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বলছে। রান্নাঘর থেকে গরম মশলার গন্ধ।

'আলুর দম করেছি,' তিনি বললেন। 'আর রুটি। লুচি ভাজতে পারি না আর, হাত কাঁপে। ধামে রোজ রাতে মাকে রাধাবল্লভী আর আলুর দম দেয়, জানো? জগদ্ধাত্রী পুজোতেও তাই। আমি রাধাবল্লভী পারি না, আলুর দমটা পারি। মায়ের অর্ধেক ভোগ।'

আমরা মেঝেতে আসন পেতে বসে খেলাম। তিনি খাওয়ার মাঝখানে বারবার উঠে আমার পাতে আলুর দম দিলেন, আমি যতই বারণ করি। একবার বললেন, 'প্রবাসে থাকো, কে রেঁধে খাওয়ায় কে জানে।' বলেই একটু থমকে গেলেন, যেন অনধিকার চর্চা করে ফেলেছেন।

আমি বললাম, 'মা খাওয়াতেন। এ বছর শ্রাবণে চলে গেছেন।'

তিনি হাতটা আমার মাথায় রাখলেন। কিছু বললেন না। কিছু বলার দরকারও ছিল না।


খাওয়ার পর তিনি আলমারির মাথা থেকে রেডিওটা নামিয়ে তক্তপোশের পাশে টুলের ওপর রাখলেন, যত্ন করে, যেন একটা ঘুমন্ত শিশুকে নামাচ্ছেন। একটা নরম কাপড় দিয়ে মুছলেন কাঠের খোলটা, কাপড়ের জালিটা। প্লাগ লাগালেন। নবটা ঘোরালেন। কিছুক্ষণ কিছু হলো না। তারপর ভেতরে ভালভগুলো ধীরে ধীরে গরম হয়ে উঠল, পেছনের ফাঁক দিয়ে কমলা আভা দেখা গেল, আর একটা খসখসে শোঁ শোঁ শব্দ বেরোতে লাগল, যেন অনেক দূরে কোথাও সমুদ্র।

'যাক, আছে,' তিনি নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন, আর বন্ধ করে দিলেন। তারপর ঝুঁকে পড়ে দেওয়ালের সকেট থেকে প্লাগটাও খুলে রাখলেন। 'বাবার নিয়ম। ভালভের রেডিও, রাতে লাগিয়ে রাখতে নেই। কাল ভোরে।'

তারপর আমরা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। বাইরে গলিতে কুকুর ডাকছে, দূরে কোথাও মণ্ডপে কাজ চলছে, হাতুড়ির ঠুকঠুক শব্দ। সরযূ হঠাৎ বললেন, 'একটা কথা বলি, হাসবে না?'

'বলুন।'

'ধামের বউমার কথা শুনেছ? মাসে দুটো একাদশীতে মায়ের লুচি ভোগ হয়। একবার বউমার শাশুড়ি বলেছিলেন, একাদশীর আগের দিন ফল মিষ্টি দিলেই হবে, লুচির দরকার নেই। সেদিন ভোররাতে বউমা শুনলেন, একটা মেয়েমানুষের গলা, জলদগম্ভীর, মেঘ ডাকার মতো ভারী। বলছে, লুচি ভোগ যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়।' তিনি আমার মুখের দিকে তাকালেন, দেখলেন আমি হাসছি কি না। আমি হাসিনি।

'আপনি বিশ্বাস করেন?'

'আমি?' তিনি একটু চুপ করে রইলেন। 'পরশু রাতে আমি নিজে শুনলাম।'

আমার গায়ের রোম খাড়া হয়ে উঠল। ঘরের হলদে বাল্বটা হঠাৎ যেন একটু টিমটিম করল, নাকি আমার চোখের ভুল।

'কী শুনলেন?'

'ঘুমের মধ্যে, না জেগে, জানি না। ভোরের দিকে। ঠিক ওইরকম গলা। ভারী, অনেক দূর থেকে আসছে, অথচ কানের ঠিক পাশে।' সরযূ একটু হাসলেন, নিজের ওপরেই যেন। 'বলল, জাল ফেল।'

'জাল ফেল?'

'জাল ফেল। ব্যস, আর কিছু না।' তিনি মাথা নাড়লেন। 'ছিয়াত্তর বছরের বুড়ি, আমি কোথায় জাল ফেলব বলো? পুকুর কোথায় পাব এই কলকাতায়? সকালে উঠে নিজেই হেসেছি। তারপর মনে পড়ল, মাকে তো জাল ফেলেই পুকুর থেকে তোলা হয়েছিল।'

ঘরটা চুপ হয়ে গেল। ঘড়ির টিকটিক।

তারপর সরযূ হঠাৎ, যেন একটা বাঁধ ভেঙে গেল, বললেন, 'আমি তোমাকে মিথ্যে বলেছি, মৃন্ময়ী।'


সেই রাতে, মহালয়ার আগের রাতে, দুটো ঘরের একটা বাড়িতে, একটা চল্লিশ পাওয়ারের বাল্বের নিচে বসে সরযূবালা ঘোষ আমাকে তাঁর জীবনের গল্প বললেন। ছেচল্লিশ বছর তিনি কাউকে বলেননি। কেন আমাকে বললেন, তিনি নিজেও হয়তো জানতেন না। হয়তো মানুষ এমন কাউকেই সবচেয়ে গোপন কথা বলে, যে পরশু চলে যাবে। হয়তো অন্য কিছু।

আমি তাঁর কথাগুলো যতটা পারি তাঁর ভাষাতেই লিখছি।

'বিয়ে হয়েছিল পঁচাত্তর সালে, শ্রাবণে। আহিরীটোলায়। ভালো ঘর, বাবা খোঁজ নিয়েছিলেন। খোঁজ নিলে কি আর সব জানা যায়? বিয়ের পর দেখলাম, মানুষটা রাতে বাড়ি ফেরে না, ফিরলে টলতে টলতে ফেরে। আর বাড়ির আসল কর্তা শাশুড়ি। তাঁর কথায় সূর্য ওঠে, তাঁর কথায় অস্ত যায়।

'পাঁচ বছর ছেলেপুলে হলো না। শাশুড়ি ঠাকুর-দেবতা, মাদুলি, জলপড়া, কিছু বাকি রাখেননি। আশি সালে পেটে এলো। শাশুড়ির সে কী আনন্দ। নাতি আসছে। বংশের প্রদীপ। ভাদ্রমাসে মেয়ে হলো।'

সরযূ থামলেন। জানলার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

'শাশুড়ির একজন জ্যোতিষী ছিল। বাড়ির সব কাজে তাকে ডাকা হতো। মেয়ে হওয়ার সাত দিনের মাথায় সে এসে ছক কাটল। অনেকক্ষণ কাটল। তারপর শাশুড়িকে আড়ালে ডেকে কী বলল, আমি শুনিনি। কিন্তু শাশুড়ি ফিরে এসে আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, আমি সেই চোখ আজও ভুলিনি। রাতে ও বাড়ির ঝি আমাকে কানে কানে বলে গেল, জ্যোতিষী বলেছে, এ মেয়ে বাপের কাল। এ বাঁচলে বাপ বাঁচবে না।'

আমার হাত দুটো কোলের ওপর শক্ত হয়ে গেল। থাই রামায়ণ। জন্মের সময় জ্যোতিষী গণনা করে বললেন, এই মেয়ে রাবণের মৃত্যুর কারণ হবে।

'তারপর থেকে আমি আর ঘুমোইনি। মেয়েকে বুকের কাছ থেকে নামাইনি। একদিন দুপুরে শুনলাম শাশুড়ি পাশের ঘরে কাকে বলছেন, পুরোনো দিনে মুখে একটু নুন দিয়ে দিত, কেউ টের পেত না, এমন কত হয়েছে। সেই রাতে মানুষটা মদ খেয়ে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, মা যা বলছে তা যদি তুই না করিস, আমি করব।'

সরযূর গলা একটুও কাঁপছিল না। এটাই সবচেয়ে ভয়ের ছিল। ছেচল্লিশ বছর ধরে মনে মনে বলতে বলতে কথাগুলো পাথর হয়ে গেছে।

'সেই রাতেই মেয়েকে কাঁথায় জড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আহিরীটোলা থেকে সিমলে হেঁটে। বৃষ্টি পড়ছিল। মেয়েটা একবারও কাঁদেনি, জানো? যেন বুঝেছিল কাঁদলে ধরা পড়ে যাবে। বাবার দরজায় যখন পৌঁছলাম, তখন রাত দুটো।

'বাবা সব শুনলেন। একটা কথাও বললেন না। সারা রাত বারান্দায় বসে বিড়ি খেলেন। ভোরে আমাকে বললেন, ওরা আসবে। কালই আসবে। মেয়েকে এমন জায়গায় পাঠাতে হবে, যেখানে ওরা কোনোদিন পৌঁছবে না। আর তোকে ফিরে যেতে হবে।

'আমি বললাম, ফিরে যাব? বাবা বললেন, হ্যাঁ। ফিরে গিয়ে বলবি, মেয়ে রাতে মরে গেছে, তুই আহিরীটোলার ঘাটে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছিস। মরা মেয়ের মা ফিরে আসে। জ্যান্ত মেয়ের মা পালায়। তুই পালালে ওরা খুঁজবে। তুই ফিরলে ওরা খুঁজবে না।'

সরযূ এই প্রথম একটু থামলেন, নিঃশ্বাস নিলেন।

'বাবা কাকে দিলেন, কোথায় দিলেন, আমাকে বলেননি। বলেছিলেন, ভালো ঘর, অনেক দূরে, ওরা মেয়েকে রানির মতো রাখবে। নাম জানতে চেয়েছিলাম। বাবা বলেছিলেন, জানলে তুই একদিন যাবি। তুই গেলে তোর পেছন পেছন ওরাও যাবে। জানিস না, সেটাই ভালো। আমি আর জিজ্ঞেস করিনি। ভয় ছিল, জানলে কোনোদিন মুখ ফসকে বলে ফেলব।

'তিন সপ্তাহ মেয়েটা বাবার কাছে লুকিয়ে ছিল। আমি ফিরে গিয়েছিলাম আহিরীটোলায়। শাশুড়ি আমার কথা বিশ্বাস করেছিলেন। কেন করবেন না? যা চেয়েছিলেন তাই তো হয়েছে।'

'তারপর?'

'তারপর মহালয়া এলো।' সরযূর চোখ রেডিওটার দিকে গেল। 'ভোরবেলা বাবা মেয়েকে নিয়ে হাওড়া গেলেন। আমি তখন আহিরীটোলার বাড়িতে, শ্বশুরবাড়ির ঠাকুরঘরের পাশের ঘরে, একা বসে। পাশের বাড়ির জানলা দিয়ে রেডিও বাজছিল। বীরেনবাবু চণ্ডীপাঠ করছিলেন। যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা। আর আমার বুক দুধে টনটন করছিল। খাওয়ানোর কেউ ছিল না। আমি দেওয়ালে মাথা ঠুকছিলাম, আর রেডিওতে বীরেনবাবু বলছিলেন মাতৃরূপেণ, মাতৃরূপেণ।'

আমি আর পারলাম না। আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল, আর আমি সেটা মুছতেও পারছিলাম না, কারণ হাত দুটো তখন আমার নিজের বশে ছিল না।

সরযূ আমার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ শুকনো। 'কেঁদো না মা। ছেচল্লিশ বছর আগের কথা। আমার কান্না সব শেষ হয়ে গেছে।'


তারপর বাকিটা খুব তাড়াতাড়ি বললেন, যেন তাড়াতাড়ি বললে কম ব্যথা লাগবে।

দুবছর পর, বিরাশি সালে, মানুষটা এক রাতে মদ খেয়ে আহিরীটোলার ঘাটে নেমেছিল, আর ওঠেনি। 'জ্যোতিষী ভুল বলেনি,' সরযূ বললেন, ঠোঁটের কোণে একটা তেতো হাসি। 'বাপের কাল হলো। মেয়ের হাতে নয়, গঙ্গার হাতে। মেয়ে তখন অনেক দূরে।'

তিনি বাবার কাছে ফিরে এলেন। শ্বশুরবাড়ির পদবি ছেড়ে দিলেন। পাড়ার লোকে, আত্মীয়েরা বলল আবার বিয়ে কর, বয়স তো যায়নি। কেউ বলল, একটা বাচ্চা দত্তক নে, মন ভালো থাকবে।

'আশি সালে, যে বছর আমার মেয়ে গেল, সে বছরই মা কাত্যায়নী এলেন এ পাড়ায়। বেনারস থেকে। একজনকে আমি জলে ভাসিয়েছি বলে মিথ্যে বললাম, আর আরেকজন সত্যি সত্যি জল থেকে উঠে এসে আমার পাশের গলিতে বসলেন। প্রথম কবছর আমি ধামের দিকে তাকাতে পারতাম না। তারপর ছিয়াশি সালে শুনলাম, মা পেতলের ছেলেমেয়ে নেবেন না বলেছেন। স্বপ্নে বারণ করেছেন।' সরযূর গলাটা এই প্রথম একটু নরম হলো। 'সেদিন আমি প্রথম ধামে গেলাম। মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, তুমি তোমার ছেলেমেয়ে ফেরত পাওনি। আমিও পাইনি। তুমি যখন পেতল নিলে না, আমিও নেব না। সেই থেকে প্রত্যেক একাদশী যাই। চল্লিশ বছর।'

'আর মেয়েটা?' আমি জিজ্ঞেস করলাম। গলা দিয়ে শব্দটা বেরোতে চাইছিল না।

'কিচ্ছু জানি না। বেঁচে আছে কি না, তাও না।' তিনি একটু থামলেন। 'তর্পণ করি না, জানো। মহালয়ায় সবাই গঙ্গায় যায়, জল দেয়। আমি যাই না। জল দিলে মেনে নিতে হয় সে নেই। আমি মানি না।'

'কিছু রাখেননি? ওর কোনো জিনিস?'

'কিচ্ছু না। রাখলে ধরা পড়ে যেতাম। শুধু একটা জিনিস মনে আছে।' তিনি হাত তুলে নিজের দুই ভুরুর মাঝখানটা ছুঁলেন। 'ওর এইখানে একটা ছোট্ট তিল ছিল। ঠিক মাঝখানে। জন্মের দিন দাই দেখে বলেছিল, এ মেয়ে ভাগ্যবতী, কপালে টিপ নিয়ে জন্মেছে। পরে ধামে গিয়ে জেনেছি, ওই জায়গাটা মা কাত্যায়নীর। আজ্ঞাচক্র।'

আমি নিশ্চল হয়ে বসে রইলাম। কপালের টিপটা মনে হচ্ছিল আগুনের মতো জ্বলছে।

'আর একটা নাম দিয়েছিলাম,' সরযূ প্রায় ফিসফিস করে বললেন। 'কাউকে বলিনি। বাবাকেও না। মেয়েটা যখন বুকে ঘুমোত, কানে কানে ডাকতাম। উমা।'

উমা। গিরিরাজের মেয়ে। বছরে একবার যে মেয়ে বাপের বাড়ি ফেরে, আর মহালয়ার ভোরে যার আসার খবর রেডিওতে বেজে ওঠে।


অনেক রাতে, প্রায় দুটোর সময়, সরযূ আলমারির নিচের তাক থেকে সেই তোরঙ্গটা আবার টেনে বের করলেন। সবার তলা থেকে একটা খাতা বের করলেন। বাকিগুলোর মতোই লাল কাপড়ের মলাট, কিন্তু অনেক পাতলা।

'বাবার শেষ খাতা। পঁচানব্বই সালে, মরার আগে, বলেছিলেন এটা পুড়িয়ে দিতে। পারিনি। কিন্তু পড়িওনি। তিরিশ বছর ধরে তোরঙ্গের তলায় পড়ে আছে।' তিনি খাতাটা আমার হাতে দিলেন, দুহাতের তালুর ওপর রেখে, ঠিক যেভাবে আমি প্রথম দিন খাতা ধরেছিলাম। 'তুমি ছবির খাতা পড়ো, তোমার চোখে হয়তো সয়ে যাবে। আমার মেয়েকে নিয়ে বাবা যদি কিছু লিখে থাকেন... আমাকে শুধু বোলো, ও বেঁচে আছে কি না। বাবা জানতেন কি না। আর কিছু বলতে হবে না।'

তারপর তিনি তক্তপোশে শুয়ে পড়লেন, দেওয়ালের দিকে মুখ করে। একটু পরে তাঁর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো।

আমি বাল্বের নিচে বসে খাতাটা খুললাম।

ছয়

খাতার প্রথম পাতায় তারিখ ১৩৮৭ সাল, ভাদ্র। নিবারণ ঘোষের হাতের লেখা তখনও মুক্তোর মতো, কিন্তু এই পাতায় কালি জায়গায় জায়গায় ধেবড়ে গেছে, যেন লেখার সময় কাগজে জল পড়েছিল।

১৩৮৭, ভাদ্র। রাত্রি দুইটায় সরযূ খুকিকে লইয়া আসিয়াছে। আহিরীটোলা হইতে হাঁটিয়া, বৃষ্টিতে ভিজিয়া। যাহা শুনিলাম, লিখিতে হাত সরিতেছে না। উহারা খুকিকে মারিবে। জ্যোতিষী বলিয়াছে বাপের কাল। হায় রে, রামায়ণ কি আজও শেষ হয় নাই?

হরিসাধনবাবুকে সব বলিলাম। বাগবাজারের হরিসাধন মিত্র, রূপবাণীর পুরাতন দর্শক, আমার বহুদিনের চেনা মানুষ। তাঁহার কন্যা সুনন্দা ও জামাতা প্রবীর পুজায় পুনা হইতে আসিয়াছে। বারো বৎসর তাহাদের সন্তান হয় নাই। হরিসাধনবাবু কাঁদিয়া ফেলিলেন। বলিলেন, নিবারণ, ঈশ্বর একজনের ঘর খালি করিয়া আরেকজনের ঘর ভরেন, ইহা তাঁহার পুরাতন খেলা।

সুনন্দা।

আমি খাতাটা কোলের ওপর নামিয়ে রাখলাম। বাল্বের আলোয় নামটা জ্বলজ্বল করছিল। সুনন্দা আর প্রবীর। আমার মা, আমার বাবা। বাগবাজারের হরিসাধন মিত্র, আমার দাদু, যাঁকে আমি কখনো দেখিনি, যাঁর একটা ছবি মায়ের আলমারিতে ছিল, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা, হাতে ছাতা।

বাকিটা পড়তে আমার অনেকক্ষণ লাগল। প্রতিটা লাইন দু'বার, তিনবার পড়তে হচ্ছিল, কারণ অক্ষরগুলো বারবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।

১৩৮৭, আশ্বিন, মহালয়া। অদ্য ভোরে হাওড়ায় খুকিকে সুনন্দার কোলে দিয়া আসিলাম। আমার নাম বলি নাই, পাড়ার নাম বলি নাই। কেবল কথায় কথায় রূপবাণীর নামটি মুখ ফসকাইয়া বাহির হইয়া গেল। সঙ্গে শশীনাথের ফ্রেমখানি দিলাম, কানুবাবুর মুখ। আমার প্রথম ছবির প্রথম মুখ। যদি কোনোদিন সে ফিরিয়া আসে, এই মুখ দেখিয়া চিনিব।

স্টেশনে কোথাও রেডিও বাজিতেছিল। বীরেনবাবু চণ্ডীপাঠ করিতেছিলেন। আমি কিছুই শুনিতে পাই নাই। গাড়ি ছাড়িবার পূর্বে পিছন ফিরিয়া চাহি নাই। চাহিলে পারিতাম না।

আমার মা বলেছিলেন, লোকটার চোখে জল ছিল, আর সে একবারও পেছন ফিরে তাকায়নি।

তারপর পাতার পর পাতা, বছরে একটা বা দুটো লাইন। কখনো কার্তিকে, কখনো অগ্রহায়ণে। বিজয়ার পর।

১৩৮৮, কার্তিক। হরিসাধনবাবু আসিয়াছিলেন। পুনা হইতে সুনন্দার চিঠি আসিয়াছে। খুকি ভালো আছে। হামা দিতে শিখিয়াছে। তাহারা নাম রাখিয়াছে মৃন্ময়ী।

১৩৮৯, শ্রাবণ। পরেশ গঙ্গায় গিয়াছে। জ্যোতিষী মিথ্যা বলে নাই, কিন্তু সত্যও বলে নাই। সরযূ ফিরিয়া আসিয়াছে। সরযূকে বলিব? বলিলে সে পুনা ছুটিবে। মেয়ের এখন অন্য মা, অন্য ঘর, অন্য নাম। দুই মায়ের টানাটানিতে মেয়েটা ছিঁড়িয়া যাইবে। চুপ রহিলাম। মা কাত্যায়নী, আমার এ পাপ তুমি লইও।

১৩৯২, কার্তিক। খুকি ইস্কুলে যাইতেছে।

১৩৯৮, অগ্রহায়ণ। খুকি পিয়ানো শিখিতেছে। মাস্টার নাকি বলিয়াছে, এমন হাত সে দেখে নাই। হাত দুইখানা নাকি শরীরের মাপে বড়।

তার নিচে, একটু ফাঁক রেখে, তিনটে শব্দ:

সরযূর হাত।

আমি আর পড়তে পারছিলাম না। খাতাটা বুকের ওপর চেপে ধরে বসে রইলাম। তক্তপোশে সরযূ দেওয়ালের দিকে মুখ করে ঘুমোচ্ছেন। পাতলা সাদা শাড়ির নিচে তাঁর পিঠটা ধীরে ধীরে উঠছে, নামছে। বড় বড় হাত দুটো বালিশের পাশে আলগা হয়ে পড়ে আছে।

শেষ পাতা। ১৪০২ সাল। হাতের লেখা এখানে আর মুক্তোর মতো নেই। কাঁপা, বাঁকা, এক একটা অক্ষর আলাদা আলাদা হয়ে গেছে, যেন প্রতিটা লিখতে আলাদা করে দম নিতে হয়েছে।

১৪০২, ভাদ্র। হরিসাধনবাবু গত হইয়াছেন। আর খবর আসিবে না। খুকির পনেরো বৎসর পূর্ণ হইল। আমারও দিন ফুরাইয়াছে।

সরযূকে এ খাতা পুড়াইতে বলিব। সে পুড়াইবে না, জানি। সে পড়িবেও না, তাহাও জানি। আমার মেয়েকে আমি চিনি।

যদি কোনোদিন কেহ এই খাতা পড়ে, এবং যদি সে খুকি হয়, তবে জানিও মা, তোমাকে কেহ জলে ভাসায় নাই। তোমার মা কেবল একটি মিথ্যা বলিয়াছিল, যে তোমাকে সে গঙ্গায় ভাসাইয়াছে, আর সেই মিথ্যার দাম সে সারা জীবন দিয়াছে। তোমাকে আমি পাঠাইয়াছিলাম। দোষ আমার। তাহাকে ক্ষমা করিবার কিছু নাই। আমাকে পারিলে করিও।

রূপবাণী ভাঙিয়া যাইবে, শুনিতেছি। সে যাক। কিন্তু রূপ যায়, বাণী তো থাকে।

খাতাটা বন্ধ করলাম। ঘড়িতে তখন তিনটে বাহান্ন।


উত্তর কলকাতা তখন জেগে উঠছে।

প্রথমে একটা দুটো জানলায় আলো জ্বলল। তারপর আরও। গলির ওপারের বাড়ির দোতলায় কেউ বাথরুমের কল খুলল, জলের শব্দ। কোথাও একটা প্রেশার কুকারের সিটি, এত ভোরে কে রাঁধছে কে জানে। একজন বুড়ো মানুষের কাশি। একটা শিশুর ঘুম-জড়ানো কান্না, তাকে কেউ চুপ করাচ্ছে। তারপর দূরে, খুব দূরে, প্রথম শাঁখ।

আর ঠিক তখনই, তিনটে পঞ্চান্নয়, আলো চলে গেল।

ঘরের বাল্বটা দপ করে নিভল। জানলার বাইরে গলির ল্যাম্পপোস্ট নিভল। পাশের বাড়ির জানলাগুলো নিভল। পুরো পাড়াটা এক নিমেষে অন্ধকারে ডুবে গেল। আর সেই অন্ধকারের মধ্যে গলির মোড় থেকে ক্লাবের ছেলেদের হতাশ চিৎকার ভেসে এলো: 'যাঃ! আজকের দিনে! জেনারেটরটা চালা, শিগগির!' কেউ উত্তর দিল, 'তেল নেই, কাল ভরিসনি?'

তক্তপোশে সরযূ নড়ে উঠলেন। 'কটা বাজে?'

'চারটে বাজতে পাঁচ।'

'আলো গেছে?'

'হ্যাঁ।'

তিনি উঠে বসলেন, অন্ধকারে। আমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছিলাম না, শুধু শাড়ির খসখস শব্দ, আর তাঁর নিঃশ্বাস। 'বাবার রেডিও,' তিনি বললেন। 'বাবার রেডিওটা চালাই।'

আমি কিছু বলার আগেই অন্ধকারে তাঁর হাত টুলের ওপর রেডিওর নবটা খুঁজে নিল। চেনা হাত, চল্লিশ বছর ধরে বছরে একবার এই নব ঘোরাচ্ছে। খট করে একটা শব্দ হলো।

তারপর, আমি জানি না কীভাবে বলব, রেডিওর পেছনের ফাঁক দিয়ে সেই কমলা আভা ফুটে উঠল। ভালভগুলো জ্বলে উঠছে, ধীরে, খুব ধীরে, যেমন ভোরের আগে আকাশের কিনারা জ্বলে ওঠে। ঘরের অন্ধকারে ওইটুকু আলো। আর তার সঙ্গে সেই খসখসে শোঁ শোঁ, দূর সমুদ্রের মতো।

তারপর শাঁখ বাজল। রেডিওর ভেতর থেকে, আর বাইরে থেকে, একসঙ্গে।

কারণ গলির প্রতিটা জানলা দিয়ে তখন আলো না থাকলেও শব্দ বেরোচ্ছিল। কারও মোবাইলে, কারও ব্যাটারির রেডিওতে, কারও ছোট্ট ব্লুটুথ স্পিকারে। সব যন্ত্র একসঙ্গে শুরু হয়নি, এক আধ সেকেন্ডের তফাতে, তাই শাঁখের আওয়াজটা গলির এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত গড়িয়ে গেল, ঢেউয়ের মতো। আর সেই ঢেউয়ের ওপর দিয়ে ভেসে এলো সেই কণ্ঠ।

আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক-মঞ্জীর; ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা; প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা………………

আমি পুনেতে বড় হয়েছি। মহালয়ার ভোরে মা রেডিও চালাতেন, বাবা ঘুম চোখে উঠে বসতেন, আমি মায়ের কোলে মাথা রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়তাম। সেই কণ্ঠ আমার শৈশবের অংশ। কিন্তু উত্তর কলকাতার এক অন্ধকার গলিতে, পঞ্চাশটা জানলা থেকে একসঙ্গে, এক-আধ সেকেন্ডের তফাতে যখন সেই কণ্ঠ শুনলাম, তখন বুঝলাম এ জিনিস আমি আগে কখনো শুনিনি। মনে হচ্ছিল একজন মানুষ নয়, পুরো পাড়াটা কথা বলছে। দেওয়ালগুলো কথা বলছে। দেড়শো বছরের পুরোনো ইটগুলো, যারা এই কণ্ঠ পঁচানব্বই বছর ধরে শুনে আসছে, তারা নিজেরাই আজ আবৃত্তি করছে।

সেই কণ্ঠ বলছিল আশ্বিনের ভোরের কথা। মেঘ সরে গিয়ে আকাশ খুলে যাওয়ার কথা। ধরণীর বাইরে, অনেক দূরের আকাশ থেকে মা আসছেন, তাঁর আসার আলো আগে আগে এসে পৃথিবীকে ছুঁয়ে দিচ্ছে, সেই কথা। আমি শব্দগুলো আলাদা করে শুনছিলাম না। শুনছিলাম শুধু কণ্ঠের কাঁপন, সেই বিখ্যাত কান্না ভেজা গলা, যা কোনো অভিনেতা শিখে নিতে পারে না, কারণ ওটা শেখার জিনিস নয়।

তারপর সংস্কৃত শুরু হলো।

যা চণ্ডী মধুকৈটভাদিদৈত্যদলনী যা মাহিষোন্মূলিনী...

রেডিওর কমলা আভায় আমি সরযূর মুখটা দেখতে পাচ্ছিলাম। চোখ বন্ধ, ঠোঁট নড়ছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলছেন, প্রতিটা শব্দ, চল্লিশ বছর ধরে মুখস্থ।

তারপর হঠাৎ তিনি চোখ খুললেন, আমার দিকে তাকালেন, আর খুব আস্তে, যেন ভয়ে, জিজ্ঞেস করলেন, 'পড়লে?'

'পড়েছি।'

'বেঁচে আছে?'

আমার গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না। মাথা নাড়লাম। হ্যাঁ।

তাঁর মুখের ওপর দিয়ে কী যে চলে গেল, আমি বর্ণনা করতে পারব না। আমি শুধু দেখলাম, ছেচল্লিশ বছর ধরে পাথর হয়ে থাকা একটা মুখ, এক মুহূর্তের জন্য, ভেঙে গেল।

'বাবা জানতেন?'

'জানতেন। পনেরো বছর পর্যন্ত সব খবর রাখতেন। প্রত্যেক বছর।'

তিনি দু'হাতে মুখ ঢাকলেন। বড় বড় হাত, পুরো মুখটা ঢেকে গেল। রেডিওতে তখন গান শুরু হয়েছে, পঙ্কজ মল্লিকের সুরে, কোরাস। জানলাগুলো থেকেও সেই গান। তারপর হাত সরিয়ে তিনি প্রায় অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথায় আছে? কেমন আছে? নাম কী রেখেছে? বলো মৃন্ময়ী, বাবা কী লিখেছেন বলো...'

আমি উত্তর দিলাম না।

আমি আমার কপাল থেকে টিপটা খুলে নিলাম। রাত্রে খোলা হয়নি। সারা রাত পরে ছিলাম। তারপর অন্ধকারে, রেডিওর কমলা আভায়, তাঁর ডান হাতটা আমার দুহাতের মধ্যে নিলাম। সেই বড় হাত। আমার হাতের মাপের হাত। তাঁর তর্জনীটা আলতো করে তুলে আমার দুই ভুরুর ঠিক মাঝখানে রাখলাম।

অন্ধকার ঘরে রেডিওর আভা, বৃদ্ধার আঙুল মৃন্ময়ীর দুই ভুরুর মাঝখানে, কোলে খোলা কৌটো।
“যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা”

ঠিক তখনই রেডিওতে, আর পঞ্চাশটা জানলায়, সেই কণ্ঠ বলে উঠল:

যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা...

সরযূর আঙুলের ডগা ছোট্ট উঁচু জায়গাটা ছুঁয়ে স্থির হয়ে গেল।

নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ॥

তিনি নড়লেন না। নিঃশ্বাসও নিলেন না বোধহয়। আঙুলটা আমার কপালে, যেখানে ছেচল্লিশ বছর আগে এক দাই বলেছিল, এ মেয়ে কপালে টিপ নিয়ে জন্মেছে।

আমি ঝোলা থেকে কৌটোটা বের করে ঢাকনা খুলে তাঁর কোলের ওপর রাখলাম। তিনি সেদিকে তাকালেনও না। তাঁর চোখ আমার মুখের ওপর, যেন একটা ছবি দেখছেন যার প্রতিটা ফ্রেম তিনি ছেচল্লিশ বছর ধরে অন্ধকারে কল্পনা করে এসেছেন, আর এখন প্রথমবার পর্দায় আলো পড়েছে। তারপর তাঁর অন্য হাতটাও উঠে এলো। দুটো হাত দিয়ে তিনি আমার মুখটা ধরলেন, যেমন করে কুমোরটুলির কারিগর প্রতিমার মুখ ধরেন চোখ আঁকার আগে। তাঁর বুড়ো আঙুল দুটো আমার গাল বেয়ে নামা জল মুছল। আঙুলগুলো কাঁপছিল।

'জাল ফেল,' তিনি ফিসফিস করে বললেন। গলাটা আর তাঁর নিজের মনে হচ্ছিল না। 'ফেলেছিলাম তো মা। ছেচল্লিশ বছর ধরে রোজ ফেলেছি। রোজ শুধু জল উঠেছে।'

তারপর, খুব আস্তে, যেন একটা ঘুমন্ত শিশুকে জাগাতে চান না এমনভাবে আমার কানের কাছে মুখ এনে একটা নাম বললেন। যে নাম তিনি কাউকে বলেননি, নিজের বাবাকেও না।

'উমা।'

রেডিওতে তখন চণ্ডীর সেই স্তব, জানলাগুলোয় সেই স্তব, গলি জুড়ে, পাড়া জুড়ে, শহর জুড়ে। আর আমি ছেচল্লিশ বছর বয়সে, এক অচেনা নামে, প্রথমবার সাড়া দিলাম।

'মা।'


ঠিক সাড়ে চারটের সময় আলো ফিরে এলো। বাল্বটা দপ করে জ্বলল, ঘরটা হঠাৎ হলদে আর অতিরিক্ত স্পষ্ট হয়ে উঠল। গলির মোড়ে ক্লাবের ছেলেদের একসঙ্গে উল্লাস, মাইকটা ঘড়ঘড় করে চালু হলো। আমি চোখ মুছে টুলের দিকে তাকালাম। রেডিওটা তখনও বাজছে। আর তার প্লাগটা, যেটা সরযূ আগের রাতে নিজের হাতে খুলে রেখেছিলেন, বাবার নিয়ম মেনে, সেটা তখনও টুলের পায়ার কাছে মেঝের ওপর পড়ে আছে। সকেট থেকে এক হাত দূরে।

আমি কিছু বললাম না। একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। হয়তো আমি ভুল দেখেছিলাম। হয়তো রাতে কখন তিনি আবার লাগিয়েছিলেন, তারপর অন্ধকারে আমার পায়ে লেগে খুলে গেছে। হয়তো যে শব্দটা আমি রেডিও থেকে আসছে ভেবেছিলাম, সেটা আসছিল পঞ্চাশটা জানলা থেকে। হয়তো কমলা আভাটা ছিল ভোরের আকাশের রং, জানলার খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে।

আর্কাইভে বাইশ বছর কাজ করে আমি শিখেছি, প্রতিটা ঘটনার একটা যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা থাকে। আমি সেই ব্যাখ্যাগুলো জানি।

কিন্তু সেদিন ভোরে আমি একটা জিনিসও শিখলাম, যা কোনো আর্কাইভ শেখায় না। কিছু ব্যাখ্যা খুঁজতে নেই। কিছু রিল জোর করে খুলতে নেই।

সাত

ভোরের গঙ্গায় কোমরজলে পাশাপাশি দুজন, আঁজলা থেকে জল ঝরছে।
“পিতৃপক্ষ শেষ হলো। দেবীপক্ষ শুরু।”

বাগবাজারের ঘাটে যখন পৌঁছলাম, তখন পুবের আকাশ ফিকে হতে শুরু করেছে।

সিমলে থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়েছিলাম। বিধান সরণী ধরে উত্তরে, হাতিবাগান পেরিয়ে, যেখানে রূপবাণী ছিল সেই জায়গাটা পেরিয়ে, শ্যামবাজারের পাঁচমাথার মোড়ে নেতাজির ঘোড়ার পাশ দিয়ে বাঁয়ে। এত ভোরেও রাস্তায় মানুষ। সবাই চলেছে একই দিকে, গঙ্গার দিকে। খালি গায়ে গামছা কাঁধে পুরুষ, লালপাড় শাড়িতে মহিলা, বাবার হাত ধরে ঘুম-চোখে বাচ্চা। প্রত্যেকের হাতে একটা ছোট পুঁটলি, তিল, যব, কুশ, ফুল। মৃতদের জন্য জল নিয়ে চলেছে জীবিতেরা।

সরযূ ট্যাক্সিতে সারাক্ষণ আমার হাত ধরে ছিলেন। একবারও ছাড়েননি। একটা কথাও বলেননি। মাঝে মাঝে শুধু আমার আঙুলগুলো একটা একটা করে ছুঁয়ে দেখছিলেন, যেন গুনছেন, যেন মিলিয়ে নিচ্ছেন।

ঘাটে ভিড় থিকথিক করছে। সিঁড়ির ধাপে ধাপে মানুষ, জলে কোমর অবধি নেমে দাঁড়িয়ে মানুষ। পুরোহিতেরা ছোট ছোট চৌকিতে বসে মন্ত্র পড়াচ্ছেন, এক-একজনকে ঘিরে দশ-বারোজন। মন্ত্রের গুনগুন, জলের ছলাৎ, দূরে স্টিমারের ভোঁ। গঙ্গার জল ধূসর, তার ওপর ভোরের প্রথম আলো সবে রুপোলি রেখা টানছে। দক্ষিণে, অনেক দূরে, হাওড়া ব্রিজের আবছা কাঠামো কুয়াশার মধ্যে ভাসছে।

আর ঘাটের একটু দক্ষিণে কুমোরটুলি। আমি জানতাম, এই মুহূর্তে সেখানে সেই বুড়ো কারিগর তুলি হাতে নিয়েছেন। আজ চক্ষুদান। আজ মা চোখ পাবেন।


একজন বয়স্ক পুরোহিত আমাদের জায়গা করে দিলেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কার তর্পণ।

'মায়ের।'

তিনি একটু অবাক হয়ে তাকালেন। মেয়েরা তর্পণ করছে, এ দৃশ্য আজকাল আর অচেনা নয়, তবু পুরোনো মানুষের চোখে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। তারপর হয়তো আমার মুখে কিছু দেখলেন, প্রশ্নটা আর করলেন না। জিজ্ঞেস করলেন, 'গোত্র?'

আমি জানতাম না। মায়ের গোত্র কখনো জিজ্ঞেস করিনি। জিজ্ঞেস করার দরকার পড়েনি। মা ছিলেন মা।

পুরোহিত মাথা নাড়লেন। 'যাঁর গোত্র জানা নেই, তাঁর কাশ্যপ গোত্র। সবাই কশ্যপ মুনির সন্তান। বলুন।'

আমি গঙ্গায় নামলাম। জল ঠান্ডা, আশ্বিনের ভোরের ঠান্ডা। হাঁটু পর্যন্ত, তারপর কোমর পর্যন্ত। দু'হাত জোড় করে আঁজলা ভরে জল তুললাম। তিল আর কুশ ভাসছিল আঁজলার জলে। আমার বড় বড় দুটো হাত, অন্য কারও হাত, ভুল করে আমার কবজিতে জোড়া। এতদিনে জানি কার। পুরোহিতের সঙ্গে সঙ্গে নাম উচ্চারণ করলাম। কাশ্যপ গোত্র। সুনন্দা বসু। জল ঝরে পড়ল আঙুলের ফাঁক দিয়ে, গঙ্গায় মিশে গেল।

তারপর আরেক আঁজলা। প্রবীর বসু। আমার বাবা।

তারপর আরেক আঁজলা। হরিসাধন মিত্র। যে দাদুকে কখনো দেখিনি, যিনি এক বৃষ্টির রাতে কেঁদে ফেলেছিলেন, আর বলেছিলেন, ঈশ্বর একজনের ঘর খালি করে আরেকজনের ঘর ভরেন।

তারপর আমি থামলাম। পুরোহিত অপেক্ষা করছিলেন। আমি পেছন ফিরে সিঁড়ির দিকে তাকালাম।

সরযূ শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে আছেন। পায়ের পাতা জলে। সাদা শাড়ির পাড় ভিজে গেছে। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন, আর তারপর, ধীরে ধীরে, তিনিও জলে নামলেন। হাঁটু পর্যন্ত। কোমর পর্যন্ত। আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন।

ছেচল্লিশ বছর তিনি তর্পণ করেননি। জল দিলে মেনে নিতে হয়, সে নেই।

আজ তিনি আঁজলা ভরলেন। দুটো বড় বড় হাত, আমার হাতের মাপের হাত, জোড়া লেগে একটা পাত্র হলো।

'নিবারণ ঘোষ,' তিনি বললেন, গলা কাঁপছিল। 'আমার বাবা।' জলটা ঝরে পড়ল।

তারপর আরেক আঁজলা ভরলেন। আমার দিকে তাকালেন। 'তোমার মায়ের নামটা আরেকবার বলো।'

'সুনন্দা।'

তিনি চোখ বন্ধ করলেন। 'সুনন্দা,' বললেন, যেন কোনো দেবীর নাম উচ্চারণ করছেন। 'আমার মেয়েকে মানুষ করে দিয়ে গেছ। পিয়ানো শিখিয়েছ, ইস্কুলে পাঠিয়েছ, হামা দিতে দেখেছ। আমি যা দেখিনি, তুমি সব দেখেছ। তোমাকে জল দেব না তো কাকে দেব?' জলটা তাঁর আঙুলের ফাঁক গলে গঙ্গায় নামল। 'তুমি জনক রাজা, মা। আমি শুধু মন্দোদরী।'

আমি অবাক হয়ে তাকালাম। থাই রামায়ণের গল্প তিনি জানলেন কোথা থেকে?

তিনি আমার মুখ দেখে একটু হাসলেন, চোখে জল নিয়ে। 'বাবার কাছে শুনেছি। আশি সালের পর বাবা খুব রামায়ণ পড়তেন। নানা দেশের রামায়ণ। আমি বুঝিনি কেন। আজ বুঝলাম।'


সূর্য উঠল।

প্রথমে আমাদের পেছনে, বাগবাজারের পুরোনো বাড়িগুলোর ছাদের ওপারে, আকাশটা লাল হলো। তারপর আলোটা আমাদের মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে আগে ছুঁল ওপারের কারখানার চিমনিগুলোর মাথা, আর তারপর হঠাৎ নেমে এলো জলে। গঙ্গার পুরো বুক জুড়ে সোনা ছড়িয়ে পড়ল। ঘাটের শত শত মানুষ, যাঁরা এতক্ষণ মাথা নিচু করে মৃতদের জল দিচ্ছিলেন, এক মুহূর্তের জন্য মুখ তুলে আলোর দিকে তাকালেন। কে যেন শাঁখ বাজাল। তারপর আরেকজন। ঘাট থেকে ঘাটে, পাড়া থেকে পাড়ায়, শাঁখের শব্দ ছড়িয়ে পড়ল, যেমন ভোরবেলা পড়েছিল রেডিওর কণ্ঠ।

পিতৃপক্ষ শেষ হলো। দেবীপক্ষ শুরু।

আমি জলে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম কাত্যায়নীর নামের সেই দুটো গল্পের কথা। এক মতে তিনি ঋষি কাত্যায়নের কন্যা হয়ে জন্মেছিলেন। আরেক মতে ঋষি কাত্যায়ন প্রথম তাঁর পুজো করেছিলেন, তাই তাঁর নাম। পণ্ডিতেরা তর্ক করেন, কোনটা সত্যি। আমি জানি, দুটোই সত্যি। একজন জন্ম দেন। আরেকজন কোলে নেন, প্রথম নাম দেন, প্রথম পুজো করেন। আর মেয়েটা সারা জীবন দুটো নামেই সাড়া দেয়।

এই এক ভোরে আমি এক মাকে জল দিয়ে বিদায় দিলাম, আর আরেক মা জল থেকে উঠে এলেন। ঠিক যেমন সিমলের এক গলিতে এক দেবী একদিন পুকুরের তলা থেকে জালে উঠে এসেছিলেন। জাল যতবার ফেলো, শুধু মা ওঠেন, সরযূ বলেছিলেন। ছেলেমেয়েরা জলেই থেকে যায়।

সবাই থাকে না। কেউ কেউ ফিরে আসে। ছেচল্লিশ বছর পরে, এক মহালয়ার ভোরে, কাঁধের ঝোলায় একটা হারানো ছবির একটিমাত্র ফ্রেম নিয়ে।


ঘাট থেকে উঠে আসার সময় সরযূ আমার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বললেন, 'আজ একাদশী নয়, অমাবস্যা। তবু আমি আজ ধামে যাব। মাকে বলব, তোমার ছেলেমেয়েরা ফেরেনি, কিন্তু আমার মেয়েটা ফিরেছে। তুমি আমার জন্য জাল ফেলেছিলে, মা। তুমি বলেছিলে, জাল ফেল। আমি বুঝিনি।' তিনি আমার দিকে তাকালেন। 'তুমি যাবে আমার সঙ্গে?'

আমি বললাম, যাব।

আমার কাঁধের ঝোলায় কৌটোটা হালকা লাগছিল। ছেচল্লিশ বছরে এই প্রথম হালকা। ফ্রেমটা এখনও ভেতরে আছে, তুলোয় মোড়া, কানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই অসহায় হাসি নিয়ে। কিন্তু এখন আর ওটা প্রশ্ন নয়। নিবারণ ঘোষ লিখেছিলেন, যদি কোনোদিন সে ফিরে আসে, এই মুখ দেখে চিনব। তিনি ফেরা দেখে যেতে পারেননি। তাঁর মেয়ে দেখল। দুই ভুরুর মাঝখানে একটা ছোট্ট তিল।

রবীন্দ্রনাথ হাতিবাগানের কাছে একটা সিনেমা হলের নাম দিয়েছিলেন রূপবাণী। হলটা নেই। তার পর্দা নেই, তার মেশিনঘর নেই, তার মেশিনঘরের সেই পনেরো বছরের ছেলেটাও নেই, যে রিল গোটাতে গোটাতে কেঁদেছিল, কেন জানে না। কিন্তু সেই ছেলেটা দশ বছর বয়সে নামটার একটা মানে করেছিল, আর লিখে রেখেছিল তার খাতায়। বড়রা বলেছিল, রূপ মানে ছবি, বাণী মানে কথা। সে ভেবেছিল, রূপ মানে একটা সুন্দর মুখ। বাণী মানে মায়ের ডাক।

দশ বছরের ছেলের ব্যাখ্যা।

ভুল বোঝেনি।

বাগবাজারের ঘাটের সিঁড়িতে, মহালয়ার রোদে, আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার মা আমাকে ডাকলেন। যে নামে আমাকে কেউ কখনো ডাকেনি। যে নাম ছেচল্লিশ বছর ধরে একটা মানুষের বুকের ভেতর জলের তলায় পড়ে ছিল, জালের অপেক্ষায়।

'উমা, আয়। বাড়ি চল।'

আমি ঘুরে তাকালাম।

সমাপ্ত

সুচন্দ্রা দাস

লেখক, আলোকচিত্রী ও শিল্পী।
গল্পে, ছবিতে, শব্দে নিজের মতো করে জীবনকে দেখা।

গল্পটা মনে থেকে গেল?