জিতাষ্টমী
যারা দূরে থাকে, তারাও কারো না কারো
ঘরে খায়, মাসি।
আশ্বিনের কৃষ্ণা অষ্টমী। শাঁখারীবাজারের গলিতে আজ শাঁখ কাটার করাতের শব্দ কম। যে কয়টা ঘর এখনও শাঁখের কাজ ধরে রেখেছে, তাদের বউ মেয়েরা আজ উপোসি। জিতাষ্টমী।
সাবিত্রী ভোররাতে উঠে মুখে এক ফোঁটা জল না ছুঁইয়ে উঠোনের কোণটা নিকিয়েছে। কোদাল দিয়ে খুঁড়েছে হাতখানেক চওড়া একটা গর্ত, তাতে বালতি থেকে জল ঢেলে বানিয়েছে ছোট্ট পুকুর। পুকুরের মাঝখানে পুঁতেছে একটা কলাগাছের চারা আর একটা বেলের ডাল। পাশে কলাপাতায় রাখা আছে কাল রাতে ভিজিয়ে রাখা ছোলা, কচি অঙ্কুর বেরিয়েছে। সঙ্গে দুটো শসা। আর আছে মাটির তিনটে পুতুল। একটা শেয়াল, একটা শকুন, আর একটা ছোট্ট মানুষ, যার মাথায় সাবিত্রী কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে মুকুট এঁকে দিয়েছে। জীমূতবাহন।
নিতাই দাওয়ায় বসে দেখছিল। ওর ডান হাতের দুটো আঙুল আর পুরো সোজা হয় না। চল্লিশ বছর শাঁখ কেটেছে, করাতের মুখে আঙুল রেখে। এখন হাত কাঁপে।
"শকুনের ঠোঁটটা বড্ড বাঁকা হয়েছে," বলল নিতাই।
"শকুনের ঠোঁট বাঁকাই হয়।"
"ভয় বাড়িয়ে লাভ কি।"
"ভয় লাগার জন্যই তো বানানো," সাবিত্রী বলল, "ভয়টাকে পুজো দিয়ে খালে পাঠিয়ে না দিলে তোমায় ঘরে বসবে জাঁকিয়ে।"
এই কথাটা আসলে ওর শাশুড়ির। তিরিশ বছর আগে, এই উঠোনেই, এই রকম একটা ছোট্ট পুকুরের পাশে বসে বুড়ি বলেছিল। সাবিত্রী তখন নতুন বউ, সোনামুখী থেকে এসেছে, স্কুল ফাইনাল পাশ। উঠোনে পুকুর কাটা দেখে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হেসেছিল। "মা, এইটুকু গর্তে কি ঠাকুর ডুব দেবেন?"
শাশুড়ি রাগ করেনি। শুধু তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। তারপর সন্ধেবেলা ব্রতকথা পড়তে বসে সেই গল্পটা শুনিয়েছিল। রাজা শালিবাহন আর রানির কথা, যাঁদের সন্তান ছিল না। হাঁসে চড়া এক ঠাকুর স্বপ্নে এসে রানিকে জিতাষ্টমী ব্রত শিখিয়ে দিয়েছিলেন, আর ব্রত করে রানি পেয়েছিলেন এক ছেলে আর এক মেয়ে। ছেলের নাম জীমূতবাহন, মেয়ের নাম সুশীলা। তারপর এল রাজার ঘরে এক বউ, রাজার মেয়ে, যার শিক্ষা সহবত ছিল না। শাশুড়িকে উঠোনে পুকুর কেটে ব্রত করতে দেখে হাসাহাসি করেছিল। তারপর বছর বছর তার কোলে সন্তান এসেছে, আর ভূমিষ্ঠ হতে না হতেই চলে গেছে।
গল্পটা শেষ করে শাশুড়ি কিছু বলেনি। সাবিত্রীও কিছু বলেনি। কিন্তু সেই রাতে ঘুমোতে পারেনি। পরের বছর থেকে সে নিজে হাতে পুকুর কেটেছে। হয়তো ভয় কিম্বা নিয়মে থাকার সুবিধা।
তিন বছর পর বাপি হয়েছিল। বিশ্বজিৎ। নামটা রেখেছিল শাশুড়ি। "জিত আছে নামে," বলেছিল বুড়ি, "জ্যান্ত থাকবে।" শাখারীদের অভাবে সংসারে বিশ্বজয় করার ভাবনা অপ্রাসঙ্গিক থাকে সারাটা বছর জুড়ে, জ্যান্ত তো থাকাটাই আসল।
বাপির ফোন চার দিন ধরে বন্ধ।
শেষ যেদিন কথা হয়েছিল, সেদিনও ঝগড়া। বাপি কেরালায় ঢালাইয়ের কাজ করে, একটা বড় হাসপাতাল বিল্ডিং উঠছে, কোম্পানির ক্যাম্পে থাকে। বলেছিল, পুজোয় আসা হবে না, ঠিকাদার ছুটি দিচ্ছে না, যে যাবে তার জায়গায় অন্য লোক ঢুকে যাবে। টাকা পাঠাবে।
"টাকা দিয়ে কী হবে? টাকা কি অঞ্জলি দেবে?" বলেছিল সাবিত্রী।
"মা, গ্রামে থেকে শাঁখ কেটে কী হত? বাবার হাত দেখোনি?"
ফোনটা সাবিত্রী নিজেই কেটে দিয়েছিল। তারপর থেকে আর লাগেনি। প্রথম দিন ভেবেছিল অভিমান। দ্বিতীয় দিন ভেবেছিল চার্জ নেই। তৃতীয় দিন থেকে আর কিছু ভাবতে পারছে না, শুধু একটা যান্ত্রিক মেয়েগলা কানে বাজছে: আপনি যে নম্বরে ফোন করেছেন, সেটি এখন পরিষেবা সীমার বাইরে।
'পরিষেবা সীমার বাইরে'। কথাটা মাথার মধ্যে ঘুরছিল, যখন সাবিত্রী শেয়াল শকুনের পুতুল দুটোকে কলাপাতায় পাশাপাশি বসাল। এই দুটোই মড়া খায়। এরাই অমঙ্গল। এদের তুষ্ট করে বিদায় দিতে হয়, যাতে সন্তানের দিকে চোখ না দেয়।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ। নির্জলা উপোসে ঠোঁট ফেটে যায়, জিভ টাকরায় সেঁটে থাকে। কিন্তু সাবিত্রীর আজ তেষ্টাটা অন্য জায়গায়।
বিকেলে পাড়ার পাঁচ-ছ'জন এয়ো এল। মিনতি, কৃষ্ণা, ফৌজদারবাড়ির পাশের বাড়ির পুতুল বউদি। সবাই উপোসি, সবার কপালে চওড়া সিঁদুর, সবার মুখ শুকনো, তবু গল্প থামে না। কলকল করেই যাচ্ছে।
"ওদের বাড়ি বড় ঠাকুরানীর পট কাল রাতেই শেষ হয়েছে," পুতুল বউদি বলল। "জানলা দিয়ে দেখলাম, আলো জ্বলছিল অনেক রাত অবধি। চোখ আঁকা হয়ে গেছে।"
ফৌজদাররা বংশ পরম্পরায় মৃন্ময়ী মায়ের তিনটে পট আঁকে। বড় ঠাকুরানী, মেজো ঠাকুরানী, ছোট ঠাকুরানী। প্রতি বছর নতুন করে আঁকা হয়। তিনজনকে দেখতে প্রায় একই রকম, শুধু শাড়ির রং আলাদা। বড় ঠাকুরানী পরেন লক্ষ্মীবিলাস শাড়ি, মেজোর শাড়ি লাল, ছোটর কমলা। বড় ঠাকুরানী হলেন মহাকালী, মেজো মহালক্ষ্মী, ছোট মহাসরস্বতী। চণ্ডীতে মায়ের যে তিন রূপ।
"মা কাল ভোরে আসছেন," মিনতি বলল। "জিতাষ্টমীর পরের দিন। সেই হাজার বছর ধরে।"
"হাজার না, এবার এক হাজার তিরিশ," নিতাই দাওয়া থেকে শুধরে দিল। "নশো সাতানব্বই সালে প্রথম পুজো। জগৎ মল্লের আমলে।"
কৃষ্ণা হাসল। "কাকা, গল্পটা বলো না। উপোসের বিকেল তো কাটছে না।"
নিতাই গল্প বলতে ভালোবাসে। এ গল্প সে বাপিকে কতবার বলেছে, ছোটবেলায়, বাপি ঘুমিয়ে পড়লেও শেষ না হওয়া অবধি থামেনি।
মল্লরাজাদের রাজধানী তখন প্রদ্যুম্নপুরে। উনিশতম রাজা জগৎ মল্ল তাঁর প্রিয় বাজপাখি নিয়ে শিকারে বেরিয়েছেন। এই বিষ্ণুপুর তখন ঘন জঙ্গল। একটা হরিণের পিছু ধাওয়া করতে করতে রাজা পথ হারালেন। ক্লান্ত হয়ে বসলেন এক বটগাছের তলায়। আর তখন শুনলেন, এক নারীকণ্ঠ বলছে। আমি এখানেই আছি। এই পুণ্যভূমিতে তোমার রাজধানী সরিয়ে আনো। মাটি খুঁড়লে আমার মুখের এক টুকরো পাবে। সেখানে আমার মন্দির তৈরি করবে।
রাজা মাটি খুঁড়ে সত্যিই ছোট্ট একটা মুখ পেলেন। গঙ্গা থেকে মাটি আনিয়ে সেই মুখকে বসিয়ে গড়ানো হল দেবীর মূর্তি। মাটির মা, তাই নাম মৃন্ময়ী। তিন বছর লাগল মন্দির গড়তে। নশো সাতানব্বই সালে প্রথম পুজো হল।
"মন্দির কতবার নতুন করে গড়া হল," নিতাই বলল, "কিন্তু মা সেই একই আছেন। গঙ্গামাটির মা। বিসর্জন হয় না তাঁর। হাজার বছর ধরে এক জায়গায় বসে আছেন, মেয়ে যেমন বাপের বাড়ির দাওয়ায় বসে থাকে।"
"আর কামান" কৃষ্ণা জিজ্ঞেস করল।
"আগে বলি হত মন্দিরে। তারপর বীর হাম্বির শ্রীনিবাস আচার্যের কাছে বৈষ্ণব মতে দীক্ষা নিলেন, বলি বন্ধ হল। এখন সবজি বলি হয়। আর শব্দই তো সব, শব্দই ব্রহ্ম, তাই তোপ দাগা হয়। একসময় মৃন্ময়ীর তোপ শুনে গোটা মল্লভূমে পুজো শুরু হত।"
সাবিত্রী এসব কিচ্ছু শুনছিল না। সে শসা দুটো ধুচ্ছিল, আর ভাবছিল কেরালায় এখন বৃষ্টি হচ্ছে কি না।
সন্ধের মুখে পুজো হল। ছোট্ট পুকুরের চারপাশে ফল, ফুল, দূর্বা, অঙ্কুরিত ছোলা। শাঁখ বাজল প্রচুর। শাঁখারীবাজারে শাঁখের অভাব নেই, প্রত্যেক বাড়ির শাঁখ প্রত্যেক বাড়ির হাতে কাটা। তারপর এয়োরা একসঙ্গে মাটির পুতুলগুলো নিয়ে চলল পাড়ার পুকুরের দিকে। জলে পা দিয়ে শেয়াল আর শকুনকে ভাসিয়ে দেওয়ার সময় সবাই মিলে বলল সেই পুরনো ছড়া, যা ওদের মায়েরা বলত, দিদিমারা বলত:
শেয়াল গেল খালকে,
শকুন গেল ডালকে,
শসা ডুবা আজকে।
তারপর শসা ডুবানো। শসার ভেতরে কয়েকটা অঙ্কুরিত ছোলা গুঁজে নিয়ে জলে ডুব দিতে হয়, আর জলের নিচেই আড়াই কামড়ে শসাটা খেয়ে ফেলতে হয়। কেউ যেন না দেখে। অমঙ্গলের চোখের আড়ালে, জলের আড়ালে, দেবতার প্রসাদ।
সাবিত্রী ডুব দিল।
আশ্বিনের পুকুরের জল ঠান্ডা, ঘোলা। প্রথমে শরীর একটু কেঁপে উঠলো তারপর চোখ বন্ধ করে জলের নিচে গিয়ে শসায় কামড় দিল। এক। দুই। আধখানা। আর তখন, ঠিক তখন, অন্ধকার জলের ভেতর তার মনে হল, কে যেন খুব কাছে, খুব আস্তে বলছে, মা।
বাপির গলা নয়। মেয়ের গলা। হাঁপাতে হাঁপাতে মাথা তুলল সাবিত্রী। মিনতি হাসছে, কৃষ্ণা কাপড় নিংড়োচ্ছে। কেউ কিছু বলেনি। নিজেদের মধ্যেই ব্যস্ত।
ফিরে এসে ভিজে কাপড় ছেড়ে সাবিত্রী উঠোনে প্রদীপ জ্বেলে বসে রইল। নিতাই শুয়ে পড়েছে। পাড়া চুপচাপ। দূরে কোথাও মাইকে পুজোর গান বাজছে, তার মাঝে মাঝে ঝিঁঝির ডাক।
তখনই দরজায় শব্দ।
একটা মেয়ে। বয়স ষোলো সতেরো হবে, বড়জোর আঠেরো। শ্যামলা, রোগা, চোখ দুটো অস্বাভাবিক বড়। পরনে একটা পুরনো ধাঁচের শাড়ি, তেমন আজকাল আর কেউ পরে না। জমিতে ছোট ছোট নকশা, পাড়ে সোনালি কাজ। পা দুটো খালি, ধুলোয় ভরা। যেন অনেক দূর থেকে হেঁটে এসেছে।
"মাধব সায়রের পথটা কোন দিকে, মাসি?"
সাবিত্রী উঠে দাঁড়াল। "এত রাতে? তুমি কোথা থেকে আসছো?"
"অনেক দূর থেকে।" মেয়েটা হাসল। হাসিতে ক্লান্তি। "ভোরে চান করতে হবে। পৌঁছতে দেরি হয়ে গেল।"
সাবিত্রী ভাবল, পুজো দেখতে আসা কোনো বাড়ির মেয়ে হবে, দলছুট হয়ে পড়েছে। কাল ভোরে মাধব সায়রে বড় ঠাকুরানীর স্নান, অনেকেই আগের রাতে চলে আসে।
"বোসো একটু। মুখ শুকিয়ে গেছে।"
মেয়েটা দাওয়ায় বসল। কপাল দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। প্রদীপের আলোয় সাবিত্রী দেখল, ওর ঠোঁটটা ফাটা। ঠিক ওর নিজের মতো।
"কিছু খাওয়া হয়নি না?"
মেয়েটা মাথা নাড়ল। "সারাদিন কিছু খাইনি।"
সাবিত্রীর ঘরে আজ রান্না হয়নি। উপোসের দিন। শুধু কলাপাতায় পড়ে আছে ব্রতের প্রসাদ, কিছু অঙ্কুরিত ছোলা, একটা শসা, দুটো কলা। প্রসাদ সে নিজে মুখে দেবে কাল সকালে, পারণের সময়। এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। তারপর কলাপাতাটা এনে মেয়েটার সামনে রাখল। সাথে এক ঘটি জল।
মেয়েটা খেল। খুব আস্তে, খুব যত্ন করে, প্রতিটা ছোলা গুনে গুনে। শসাটা তুলে নিয়ে কামড় দিল। এক। দুই। তারপর অর্ধেকটা কামড়ে বাকিটা পাতায় নামিয়ে রাখল।
আড়াই কামড়।
সাবিত্রী লক্ষ করল, কিন্তু কিছু বলল না। হয়তো এ মেয়েও ব্রত করে, হয়তো ওর মা শিখিয়েছে।
"তোমার মুখটা অমন কেন, মাসি?" জল খেয়ে মেয়েটা জিজ্ঞেস করল।
কেন বলল, সাবিত্রী নিজেও জানে না। হয়তো উপোসে মাথা হালকা হয়ে ছিল, হয়তো অন্ধকারে অচেনা মুখের কাছে মন খোলা সহজ। সে বলল বাপির কথা। কেরালার কথা। শেষ ঝগড়ার কথা। 'টাকা কি অঞ্জলি দেবে?' চার দিন বন্ধ ফোনের কথা।
মেয়েটা চুপ করে শুনল। তারপর বলল, "আমিও তো বাপের বাড়ি ছেড়ে থাকি, মাসি। সারা বছর। বছরে একবার আসি।"
"তোমার মা কিছু বলে না?"
"বলে।" মেয়েটা হাসল। "রাগ করে। তারপরেও পথ চেয়ে বসে থাকে। এবারও বসে আছে।"
একটু থেমে বলল, "যারা দূরে থাকে, তারাও কারো না কারো ঘরে খায়, মাসি। আমি যেমন আজ তোমার ঘরে খেলাম। তোমার ছেলেও খাবে।"
সাবিত্রীর চোখে জল এল। সে মুখ ফেরাল।
যখন ফিরে তাকাল, মেয়েটা উঠে দাঁড়িয়েছে।
"পথটা বলে দাও।"
সাবিত্রী গলির মুখ অবধি গিয়ে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। মেয়েটা অন্ধকারে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। পায়ের শব্দও শোনা গেল না।
ফিরে এসে সাবিত্রী দেখল, কলাপাতায় আধখাওয়া শসাটা পড়ে আছে। ছোলাগুলো সব খাওয়া। একটাও পড়ে নেই।
ভোর হয়েছে।
প্রথম তোপটা যখন পড়ল, সাবিত্রী তখন জেগেই ছিল। সারারাত ঘুম আসেনি। শব্দটা এল গোপাল সায়রের দিক থেকে, বুকের ভেতর অবধি কাঁপিয়ে দিয়ে। নিতাই ধড়মড় করে উঠে বসল।
"এসে গেছেন," বলল নিতাই। চোখে জল। প্রতি বছর এই সময়টায় ওর চোখে জল আসে, কেন সে নিজেও জানে না।
সাবিত্রী তখনও উপোসি। পারণ হয়নি। সে কাপড় বদলে বেরিয়ে পড়ল। মন্দিরের সামনে তখন ভিড়। ঢাক, কাঁসর, সানাই। রাজপুরোহিতরা মাধব সায়রে বড় ঠাকুরানীকে স্নান করিয়ে নিয়ে আসছেন। পট আসছে ছাতার আড়ালে, যেমন রাজবাড়ির মেয়ে আসে। মন্দিরের চত্বরে ঢুকতেই গোপাল সায়রের পাড় থেকে পরপর তিনটে তোপ।
পট রাখা হল একটা বেদির ওপর। আরেক প্রস্থ পুজো। রাজবাড়ির মেয়েরা এগিয়ে এলেন বরণডালা হাতে। সিঁদুর ছোঁয়ালেন পটে। এই সিঁদুরের ছোঁয়াতেই মল্লভূমে দুর্গাপুজো শুরু হয়, সারা বাংলার দুসপ্তাহ আগে। এখন থেকে পনেরো দিন রোজ চণ্ডীপাঠ। মল্লরাজবংশের নিজস্ব বলিনারায়ণী পুঁথি মেনে পুজো, যার মন্ত্র আর কোথাও হয় না। চতুর্থীতে আসবেন মেজো ঠাকুরানী, ষষ্ঠীতে ছোট ঠাকুরানী, আর সেদিন থেকে মন্দিরের দরজা খুলে যাবে সবার জন্য।
তারপর মেঝেতে পাতা হল পানপাতা। একটার পর একটা, সারি সারি, মূল মন্দিরের দরজা অবধি। পানপাতায় পা রেখে বড় ঠাকুরানী ঢুকলেন মৃন্ময়ীর ঘরে।
আবার তিন তোপ।
সাবিত্রী ভিড় ঠেলে একটু সামনে গেল। পটটা এখন বেদি থেকে তোলা হচ্ছে। এক ঝলক দেখল সে। শ্যামলা মুখ। অস্বাভাবিক বড় দুটো চোখ, কাল রাতে ফৌজদারবাড়িতে আলো জ্বেলে আঁকা। আর শাড়ি। জমিতে ছোট ছোট নকশা, পাড়ে সোনালি কাজ।
"লক্ষ্মীবিলাস শাড়ি," পাশ থেকে পুতুল বউদি ফিসফিস করে বলল। "বড় ঠাকুরানী সবসময় এটাই পরেন।"
সাবিত্রী কিছু বলল না। তার মনে পড়ল গতকাল রাতের খালি পা দুটো। ধুলোয় ভরা, আর 'অনেক দূর থেকে এসেছি।'
তারপর সে নিজেকে বোঝাল। উপোসের রাত। মাথা হালকা ছিল। কোনো পুজো দেখতে আসা মেয়ে, পথ হারিয়েছিল। সে তো উৎসবের সময় মানুষ মানুষের ঘরে খায়। এর বেশি কিছু না।
তবু হাত জোড় করার সময় তার আঙুল কাঁপছিল।
বাড়ি ফিরতেই নিতাই দরজায় দাঁড়িয়ে। হাতে ফোন। মুখটা অদ্ভুত।
"একটা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল। অচেনা। ধরতে পারিনি, হাত কাঁপছিল। আবার আসছে গো।"
ফোনটা বাজছিল। সাবিত্রী ধরল।
"মা?"
পৃথিবীটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
"মা, শুনতে পাচ্ছ? আমি বাপি। আমার ফোনটা ভেঙে গেছে মা, সাইটে পড়ে গিয়েছিল ভারার ওপর থেকে। আমি ঠিক আছি গো, আমার কিছু হয়নি। নতুন ফোন কেনার টাকা ছিল না, মাইনে এই সপ্তাহে দেবে বলেছে..."
সাবিত্রী কথা বলতে পারছিল না। শুধু শুনছিল।
"কাল রাতে... শোনো মা, এখানে ক্যাম্পে একজন মাসি আছে, মেস চালায়, এখানকার লোক। বাংলা জানে না, আমি মালয়ালম জানি না, হাত পা নেড়ে কথা হয়। কাল রাতে আমি খেতে যাইনি, মনটা ভালো ছিল না। উনি থালা নিয়ে আমার ঘরে চলে এলেন। ভাত, ডাল, একটা কিছু তরকারি। জোর করে খাওয়ালেন। তারপর নিজের ফোনটা দিয়ে বললেন, ইশারায়, মা কে ফোন কর। কী করে বুঝলেন জানি না। আমি তো কিছু বলিনি ওঁকে।"
সাবিত্রী চোখ বন্ধ করল। মনে পড়ল, "যারা দূরে থাকে, তারাও কারো না কারো ঘরে খায়, মাসি।"
"কাল রাতে করিসনি কেন?"
"অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল মা। ভাবলাম তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ। আজ ভোরে ওঁর কাছ থেকে আবার চেয়ে নিয়ে করছি।"
"আমি ঘুমোইনি।"
ওপাশে একটু চুপ। তারপর বাপির গলা নরম হয়ে এল। "আজ জিতাষ্টমী ছিল না? তুমি উপোস ছিলে?"
"আছি। এখনও খাইনি।"
"খেয়ে নাও মা। এখনই। আমি ফোন ধরে আছি।"
সাবিত্রী রান্নাঘরে গেল। কলাপাতাটা তখনও দাওয়ায়, আধখাওয়া শসাটা নিয়ে। সে সেটার দিকে একবার তাকাল। তারপর ঘরে রাখা অন্য শসাটা, ব্রতের দ্বিতীয় শসাটা তুলে নিল। এক ঘটি জল।
ফোনটা কানে ধরে, ছেলের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে শুনতে, সে জল খেল।
"মা।"
"বল।"
"সেদিন যে বলেছিলাম... বাবার হাতের কথা..."
"থাক।"
"না, শোনো। আমি পুজোয় আসতে পারব না। কিন্তু লক্ষ্মীপুজোর পর ছুটি চেয়েছি। কালীপুজোয় আসব।"
"আসিস।"
"আর মা, ওই মাসিকে কী দেব বলো তো? কিছু নেবেন না, আমি জিজ্ঞেস করেছি।"
সাবিত্রী একটু ভাবল। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল মন্দিরের দিকের আকাশ, যেখানে তোপের ধোঁয়া তখনও পুরো মিলিয়ে যায়নি।
"বিষ্ণুপুরের একটা শাঁখা নিয়ে যাস। তোর বাবা কেটে দেবে। হাত কাঁপে, তবু পারবে।"
নিতাই পাশে দাঁড়িয়ে শুনছিল। কিছু বলল না। শুধু ডান হাতটা মুঠো করল, খুলল, আবার মুঠো করল। যেন দেখে নিচ্ছে, আঙুলগুলো এখনও ওর কথা শোনে কি না।
সেদিন বিকেলে সাবিত্রী উঠোনের ছোট্ট পুকুরটা বুজিয়ে দিল। কলাগাছের চারাটা তুলে পুঁতল টগর গাছের পাশে। বেলের ডালটা রাখল তুলসীতলায়। আধখাওয়া শসাটা কী করবে, ভেবে পেল না অনেকক্ষণ। শেষে কলাপাতায় মুড়ে, সন্ধের মুখে, পাড়ার পুকুরে গিয়ে জলে ভাসিয়ে দিল।
কোনো ছড়া বলল না। শুধু মনে মনে বলল, ঘরে ফিরেছ মা। আমার ছেলেকেও ঘরে ফিরিয়ে দিও।
দূরে মৃন্ময়ীর মন্দির থেকে তখন ভেসে আসছিল সন্ধ্যার চণ্ডীপাঠ। পনেরো দিনের পুজোর প্রথম সন্ধ্যা। হাজার তিরিশ বছর ধরে যে মেয়ে প্রতি বছর বাপের বাড়ি ফেরে, সে ফিরেছে।
আর কেরালার এক মেস ঘরে এক মাঝবয়সী মহিলা, সেদিনও হয়তো কারো ছেলের থালায় ভাত বেড়ে দিচ্ছিলেন। এমনিই। কোনো ব্রত ছাড়া, কোনো পুঁথি ছাড়া, কোনো তোপ ছাড়া।
যার নাম সাবিত্রী কোনোদিন জানবে না।
~ Suchandra Das
#suchandraofficial
সুচন্দ্রা দাস
লেখক, আলোকচিত্রী ও শিল্পী।
গল্পে, ছবিতে, শব্দে নিজের মতো করে জীবনকে দেখা।
