হরিচরণ
দরজাটা খোলাই রাখুন, বাবু।
এ বাড়ির সদরে ভারী পাল্লা।
দরজাটা খোলাই রাখুন, বাবু। এ বাড়ির সদরে ভারী পাল্লা। একটু ঠেলা খেলেই বসে যায়। বাইরে থেকে ধাক্কা দিলে মনে হবে কেউ বুঝি ওপাশে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিঁড়ির পাশটায় বসতে পারেন। ওপর থেকে চুন খসছে বটে, তবে গায়ে পড়বে না। আপনার হাতে বাড়ির কাগজ দেখেই বুঝেছি। এর আগেও দু একজন এসেছিলেন। তাঁরা উঠোন মেপে, কড়িকাঠ গুনে চলে গেছেন। আপনি প্রথম মানুষ, যিনি জিজ্ঞেস করলেন, ডাক্তারবাবুর কী হয়েছিল।
আমার নাম হরিচরণ। এ বাড়িতে যখন ঢুকি, অমরেশবাবু ইস্কুলে পড়েন। পরে ডাক্তার হলেন, বিয়ে করলেন, মেয়ে হল। তাঁর বাবার আমলের চাকর বলতে শেষ অবধি আমিই ছিলাম।
পঁয়ত্রিশ বছরের চাকরি। কোন দরজার কবজায় কখন তেল দিতে হয়, কোন শিকের মাথা নড়বড়ে, সব জানতাম। কেবল ওই সিঁড়ির নীচের কুঠুরিটার ভেতরে কী আছে, সে খোঁজ কোনোদিন নিইনি।
আমাদের বাদুড়বাগানের গলিতে তখন সন্ধের পরে জুড়িগাড়ি ঢুকলে দু দিকের লোককে পাশ ফিরে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়াতে হত। খোলা নর্দমার ওপর তক্তা পাতা থাকতো। বর্ষায় তক্তার তলা থেকে এমন গন্ধ উঠত যে রান্নাঘরে পাঁচফোড়ন পড়লেও চাপা পড়ত না। সদর থেকে বাড়িটা ছোট দেখায়, ভেতরে দুটো উঠোন, ঠাকুরদালান আর পেছনে চৌবাচ্চা। দুপুরবেলা ছাতের কার্নিশে কাক বসলে তার ছায়া মাঝের উঠোনে এসে পড়ত।
ডাক্তারবাবুর মায়ের একটি দোষ ছিল। মৃত মানুষের খবর শুনতে ভালোবাসতেন। তাঁর ছোট ছেলেটি জ্বরে মারা যাওয়ার পরে নিতাই গুণিন নামে এক লোকের যাতায়াত শুরু হয়।
নিতাই রোগা মানুষ। এক কাঁধ উঁচু, অন্যটা নিচু। বাঁ হাতের কড়ে আঙুল ছিল না। কথা বলতে বলতে বুকে সাঁইসাঁই শব্দ উঠত। একটা তামার কৌটো থেকে কী যেন শুঁকতেন। বলতেন, মৃত ছেলেটি রাত্রে মায়ের কাছে আসে, কিন্তু সকলের সামনে কথা বলতে লজ্জা পায়।
আসর বসত আলো নিভিয়ে। অন্ধকারে কখনও ছোট ছেলের গলা শোনা যেত, কখনও খাটের তলা থেকে টোকা পড়ত। বড়মা কাঁদতেন। নিতাই পেতেন টাকা, চাল, কাপড়। আমি তাঁকে একবার ঠাকুরদালানের পেছনে বসে নাক চেপে ছোট ছেলের গলায় কথা বলা অভ্যাস করতে দেখেছিলাম। কাউকে বলিনি। বড়মা ওইটুকু সান্ত্বনা পেতেন। আমি সেটায় সন্দেহ ঢোকাতে চাইনি।
অমরেশবাবু তখন ডাক্তারি পড়েন। তাঁর বন্ধু কেদারবাবু প্রায়ই আসতেন। কেদারবাবু পরে ইস্কুলে বিজ্ঞানের মাস্টার হয়েছিলেন। সেই বয়সেই বলতেন, দেশের সর্বনাশ করছে এই অজ্ঞতা আর বুজরুকি। যত্তসব বেল্লিকের দল।
এক রাতে দুই বন্ধু নিতাইকে ধরে ফেললেন। খাটের তক্তায় সুতো বাঁধা ছিল। টানলে টোকা পড়ে। কৌটোর তলায় লুকোনো ছিল ছোট বাঁশের নল, গলার স্বর পালটানোর জন্যে।
নিতাই হাতজোড় করলেন, পা ধরে আছাড়ি পিছাড়ি করলেন। কেদারবাবু ছাড়লেন না।
সিঁড়ির নীচে ওই যে নিচু কুঠুরি, এককালে সেখানে কয়লা রাখা হত। জানলা নেই। ভিতরের দেওয়ালে একটি সরু ঘুলঘুলি ছিল, সেটাও ইঁদুরের ভয়ে বন্ধ করা। অমরেশবাবু বললেন, নিতাই সেখানে বসে তাঁর কোনও মৃত সঙ্গীকে ডাকুন। সেই সঙ্গী এসে বাইরে থেকে খিল খুলে দিলেই তাঁরা ক্ষমা চাইবেন।
নিতাই প্রথমে হাসার চেষ্টা করেছিলেন। তারপর বুঝলেন, কেউ ঠাট্টা করছে না।
বললেন, ‘আমার দমের ব্যামো, বাবু। অন্য শাস্তি দিন।’
আমাকে বলা হল খিল লাগাতে।
লাগিয়েছিলাম।
প্রথমে দরজায় ধাক্কা পড়ল। তারপর অনুনয়। তারপর কেবল ওই কথাটা, ‘হরি, একটু ফাঁক কর। পুরো খুলতে হবে না।’
দুই বন্ধু ওপরের ঘরে খেতে গেলেন। পরে তাস বসল। আমি দুবার বলতে গিয়েও ফিরে এলাম। একবার কেদারবাবু হেসে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ নিতাই মরে গিয়ে তোমার ঘাড়ে ভুত হয়ে চাপবে? হা হা হা।'
এঁটো বাসন নামাবার সময় কুঠুরির সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। ভেতর থেকে আমার পায়ের শব্দ চিনেছিলেন। বললেন, ‘তোর পায়ে পড়ি।’ তারপর দরজার নিচ দিয়ে হাত বার করার চেষ্টা করলেন। ফাঁক এত সরু, আঙুলের ডগাটুকু ঢুকছিল না। আমি হাতে এক ঘটি জল নিয়ে দাঁড়িয়ে। বললাম, ‘বাবুরা নামলে বলব।’ জলটা তাঁকে দেওয়ার কোনও উপায় আছে কি না, তা-ও খুঁজিনি।
শেষরাতে আর ডাক শুনিনি। ভেবেছিলাম ঘুমিয়ে পড়েছেন।
সকালে দরজা খুলতে গিয়ে আটকালো। বেশ জোরে ধাক্কা দিয়ে খুলতে হলো। নিতাই দরজার গায়ে মুখ চেপে বসেছিলেন। হাঁটু দুটো বুকের কাছে। ঠোঁটের এক পাশ কাঠের ফাঁকে ঢোকানো, যেন ওইটুকু পথ দিয়ে কিছু টেনে নিচ্ছেন। বাঁ হাতের তিনটি নখ উঠে গিয়েছিল।
অমরেশবাবু পরীক্ষা করে বললেন, বুকে পুরনো রোগ ছিল। রাতেই বন্ধ হয়ে গেছে।
বড়মাকে বলা হল, লোকটা টাকা নিয়ে পালিয়েছে। কুঠুরিতে আবার কয়লা ঢুকল। কয়েক মাস বাদে দরজার সামনে আলমারি বসানো হল। আমি চাবিটা ফেলে দিতে চেয়েছিলাম। ডাক্তারবাবু বারণ করেছিলেন। বাড়ির চাবি হারানো তাঁর পছন্দ নয়। আমি যদি এটার কোনো যুক্তি খুঁজে পাইনি।
যাইহোক, সতেরো বছর পরে সেই আলমারি সরানো হয়। বড়মা তখন নেই। অমরেশবাবুর বেশ পসার। নিচতলায় রোগী বসার জায়গা বাড়াবেন বলে মিস্ত্রি লেগেছে। নতুন আরো চাকর বাকর ঢুকেছে বাড়িতে। রান্নার জন্য কুঠুরির দরজা খুলে কয়লা বার করার সময় কাঠের নিচের দিকে অত আঁচড় দেখে একজন বলল, ‘ভেতরে বেড়াল আটকা পড়েছিল নাকি?’
প্রশ্নটা বাড়ির মালিকের কানে পৌঁছানোর কথা নয় তবুও কিভাবে যেন অমরেশ বাবু জানতে পারলেন। উনি তখন রোগী দেখছিলেন। হাতের কলমটা রেখে উঠে এলেন। অনেকক্ষণ বসে আঁচড়গুলো দেখলেন। তারপর আঙুল দিয়ে কাঠে ঘষে আবার শুঁকলেন।
সেদিন দুপুরে ভাত খেতে বসে বললেন, ‘তরকারিতে কয়লার গুঁড়ো পড়েছে কেন?’
তরকারি পরিষ্কার ছিল। গুঁড়োটা লেগেছিল তাঁর দাঁতে।
প্রথম কদিন বিশেষ কিছু হয়নি। মাঝরাতে উঠে বসতেন। জানলা খুলে দিতে বলতেন। জানলা খোলা থাকলেও বলতেন, খোলা নেই। আমি মশারি তুলে দেখাতাম, পাতাগুলো নড়ছে। তিনি সেই দিকে চেয়ে থাকতেন।
এক রাতে জল দিতে গিয়ে দেখি বিছানা খালি। গিন্নিমা ঘুমোচ্ছেন। নিচে নামতে গিয়ে ডাক্তারবাবুকে পেলাম। সিঁড়ির শেষ ধাপে উবু হয়ে বসে কুঠুরির দরজায় ঠোঁট লাগিয়ে আছেন।
ডাকতেই উঠে দাঁড়ালেন। চোখে ঘুম ছিল না।
‘কী হয়েছে, বাবু?’
‘ভেতরে বাতাস ঘুরছে।’
কুঠুরিটা তখন খালি। দরজা খুলে দেখালাম। তিনি ঢুকলেন না। বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের গলায় হাত বোলাতে লাগলেন।
পরদিন সকালে গিন্নিমা আমাকে তাঁর বালিশ দেখালেন। সাদা খোলের ওপর মানুষের মুখের ছাপ। নাক, ঠোঁট, থুতনি, সব কয়লার গুঁড়োয় আঁকা। কিন্তু ছাপটা যে পাশে, সে পাশে ডাক্তারবাবু মাথা রাখেননি। ছাপটা বালিশের নিচে।
গিন্নিমার নাম সুরবালা। শান্ত মানুষ ছিলেন। কিছু ভয় পেলে আগে মেয়েকে আড়াল করতেন, তারপর আমাদের ডাকতেন। সেদিনও আট বছরের মণিকে ছাতে পাঠিয়ে বালিশটা বার করেছিলেন। বললেন, ‘রাত্রে কেউ নিচ থেকে মুখ ঠেকিয়ে ছিল, হরিদা?’
খাটের নিচে তাকালাম। কিছু নেই। কেবল মেঝের ধুলোর ওপর তিনটি পাশাপাশি রেখা, খাটের মাথা থেকে দেওয়াল পর্যন্ত।
"গিন্নি মা বালিশের পিছনে মুখ রাখতে গেলে তো খাট আর বালিশের মাঝে ঢুকতে হবে।"
"ওসব জানি না হরিদা। এই মুখ তো আমি আঁকিনি।"
সেই থেকে বাড়ির আবহাওয়া বদলে গেলো।
সারাদিন রোগীর ভিড়। সদর খোলা, উঠোনে রোদ। অথচ বিকেল নামলেই মনে হত ভিজে কাপড় মুখের ওপর চাপা পড়ছে। প্রদীপ নিভত না। শিখাগুলো কেমন ছোট হয়ে যেত। রান্নার ঝি সুখদা বলত, উনুন ধরানোর সময় মুখ কাছে নিলেই উলটো দিক থেকে কেউ ফুঁ দিচ্ছে। চৌবাচ্চার জলের ওপর কালো সর পড়ত। তুলে ফেললে আবার পড়ত। এক সকালে মণি বলল, ‘হরিদা, বাবার ঘরে যে লোকটা থাকে, সে কি জল খেতে জানে না?’
‘কোন লোক?’
‘বাবার পেছনে থাকে। বাবা জল খেয়ে গ্লাস রাখলে লোকটা গ্লাসের তলায় মুখ দেয়।’
বকেছিলাম। শিশুকে বকলে নিজের ভয়টা খানিক কমে। সেদিন বিকেলেই ডাক্তারবাবুর জলের গেলাস তুলতে গিয়ে নিচের দিকে ভেজা দাগ পেলাম। কেউ চেটে চেটে জল খেলে যেমন দাগ পরে।
বিকেলে রোগী দেখা বন্ধ করলেও, দিনের আলোয় তখনও তিনি রোগী দেখতেন। কালো কোট পরতেন, ঘড়ি ধরে নাড়ি গুনতেন, তারপর নিরাময় লিখতেন, পুড়িয়া দিতেন।
ডাক্তারবাবুর টেবিলের পেছনে সারি সারি ওষুধের শিশি। এক দুপুরে বাইরে বসা রোগীদের নাম লিখতে এসে দেখি একখানা চিরকুট এগিয়ে দিচ্ছেন। তাতে লেখা, ‘আজ আর কাউকে পাঠিয়ো না।’ মুখে বললেন না কেন, জিজ্ঞেস করলাম। তিনি দুপাশে খাপছাড়া মাথা নাড়লেন। তারপর ঠোঁট একটু ফাঁক করতেই টেবিলের নিচ থেকে অন্য একটা গলায় উত্তর এল, ‘কথা বললে আমার বাতাস কমে যাবে।’
আমি পিছিয়ে গেলাম। ডাক্তারবাবুর চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। নিজের দুটো ঠোঁট আঙুলে টিপে ধরে বসেছিলেন। টেবিলের তলায় কেবল তাঁর জুতোজোড়া। বাঁ পায়ের জুতোর ভেতর থেকে বুড়ো আঙুলটা বেরিয়ে মেঝে আঁচড়াচ্ছিল। অথচ উনি কখনও ছেঁড়া জুতো পড়তেন না।
দুজন ডাক্তার এসে দেখে গেলেন। ওষুধ বদলাল, আহার বদলাল। এক সাহেব ডাক্তার কিছুদিন শহরের বাইরে নিয়ে যেতে বললেন। পরদিন গাড়ি এল। ডাক্তারবাবু নিজেই পোশাক পরে নিচে নামলেন। কিন্তু চৌকাঠে পা দিয়েই হাঁটু ভেঙে পড়ে ছটফট করতে লাগলেন। মনে হল তাঁর দম আটকে আসছে। টেনে ভেতরে আনতেই শ্বাস ফিরল।
একদিন রাতে ধুপ করে শব্দ। আমি দৌড়ে গেলাম। ডাক্তারবাবু খাট থেকে পড়ে গেছে। আমি খাটে তোলার জন্য বাঁ হাতটা আমার ঘাড়ের উপর দিয়ে নিয়ে চাগাড় দিতে গিয়ে বসে পড়লাম। ভয়ংকর ওজন বেড়েছে। তারপর আমি আর গাড়োয়ান মিলে কোনমতে তাঁকে সেদিন রাতে খাটে তুলেছিলাম। অথচ আগের দিন নিজের হাতে জামা পরিয়েছি। কাঁধের হাড় গোনা যাচ্ছিল।
কেদারবাবুকে খবর দেওয়া হল।
তিনি প্রথম রাতে বন্ধুর ঘরেই থাকবেন বললেন। সকালে তাঁর মুখ দেখে মনে হল ঘুমোননি। আমাকে আলাদা ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, কুঠুরির চাবি কোথায়। দিলাম। দরজা খুলে টানা আধঘণ্টা ভেতরে ছিলেন। বাইরে এসে হাত ধুলেন। অনেকক্ষণ ধরে।
‘সেদিন রাতে তুমি শেষ কখন ওর ডাক শুনেছিলে, হরি?’
এত বছর পরে কেউ প্রথম প্রশ্নটা করল।
বললাম, ‘তৃতীয়বার তামাক দিয়ে নামার সময়।’
‘আমরা তখন জেগে?’
আমি উত্তর দিইনি।
কেদারবাবু বললেন, ‘অমরেশের মনে ব্যাপারটা ফিরে এসেছে। সেই অপরাধবোধ শরীরে কাজ করছে। মনকে বিশ্বাস করাতে পারলে সেরে উঠবে।’
সেই বিশ্বাস করানোর জন্যেই শিবু নস্করকে আনা।
শিবু এককালে যাত্রায় ভূত সাজত। পরে তাবিজ দিত, ভর ছাড়াত। তাকে আমি চিনতাম। কেদারবাবু সদরের ঘরে বসিয়ে খোলাখুলি বললেন, কী করতে হবে। ধুনো জ্বলবে, কিছু মন্ত্র পড়বে, শেষে ঘোষণা করবে যে লোকটা চলে গেছে।
শিবু বলল, ‘চলে যাওয়ার একটা লক্ষণ তো দেখাতে হবে।’
কেদারবাবু ঠিক করলেন, উঠোনে রাখা পিতলের ঘটি আপনা থেকে উলটে পড়বে। সরু কালো সুতো বাঁধবেন তিনিই। শিবুর ইশারায় পাশের ঘর থেকে টান দেবেন।
যে হাতে নিতাইয়ের সুতো ধরে টেনে বার করেছিলেন, সেই হাতে তাঁকে নতুন সুতো মাপতে দেখলাম। দড়ির দোকানে যেতে পারছিলেন না। আমাকেই পাঠালেন। ফেরার পরে পয়সার হিসেবও চাইলেন না।
আসর বসল বৃহস্পতিবার। বাড়িতে আমরা সাতজন। রোগী দেখা বন্ধ। গাড়োয়ানকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। বাইরে তখন সন্ধের বৃষ্টি সবে থেমেছে। নর্দমার জল নামার কুলকুল শব্দ উঠছে। গিন্নিমা মণিকে নিয়ে ওপরেই থাকবেন বলেছিলেন। কিন্তু মেয়ে কাঁদতে লাগল। বলল, ওপরের ঘরে একা থাকলে বাবা দেওয়ালের ভেতর দিয়ে আসে।
ডাক্তারবাবুকে দালানে বসানো হল। তাঁর চোখ খোলা। বুক উঠছে নামছে। কিছুক্ষণ বাদে লক্ষ করলাম, জামার বুকটা নামার পরেও ভেতর থেকে আরও একটা দীর্ঘ শ্বাস বেরোচ্ছে। যেন প্রথম মানুষটির নিশ্বাস ফুরোলে দ্বিতীয়জন শুরু করছে।
শিবু লাল কাপড় পরে এসেছিল। কপালে সিঁদুর। আমায় আড়ালে বলল, ‘ধুনো বেশি দিসনি। আমার কাশি আছে।’
ধুনুচি নামিয়ে রাখার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারবাবু মুখ তুললেন।
‘ওরও দমের ব্যামো?’
গলাটা তাঁরই। কিন্তু বলার সময় মুখে এমন একটু হাসি এল, যা তাঁর মুখে কখনও দেখিনি। শিবু আমার দিকে তাকাল। আমি চোখ নামালাম।
প্রথমে সব ঠিকই চলছিল। শিবু বিড়বিড় করে মন্ত্র বলছে। কেদারবাবু পাশের ঘরে। গিন্নিমা মেয়ের কানে হাত চাপা দিয়ে বসে। সুখদা ঠাকুরঘর থেকে গঙ্গাজল এনেছিল। তার হাত এত কাঁপছিল যে বাটি থেকেই জল মেঝেতে পড়ছিল।
একসময় ডাক্তারবাবু সোজা হয়ে বসলেন। বুকের দুরকম শব্দ বন্ধ হয়েছে। তিনি গিন্নিমার দিকে তাকিয়ে জল চাইলেন। গিন্নিমা আমার হাত থেকে গেলাস নিয়ে নিজেই খাওয়ালেন। মণি মায়ের হাত সরিয়ে বাবাকে দেখল। কতদিন পরে চেনা গলায় কথা শুনছে। একটু হেসে তাঁর হাঁটুতে হাত রেখেছিল।
সেই মুহূর্তে আমিও বিশ্বাস করেছিলাম, সব ঠিক হয়ে গেছে। মিথ্যেই হোক, মানুষটা তো বাঁচল। দালানের বাইরে রাস্তা থেকে কারও সবজি হাঁকার আওয়াজ আসছিল। বড় স্বাভাবিক, বড় কাছের শব্দ। মনে হয়েছিল, রাতটা কাটলে সকালে ঘরগুলো ধুয়ে ফেলব। পরিষ্কার চাদর পাতব।
তারপর হঠাৎ সিঁড়ির নিচ থেকে শব্দ হল। নখ দিয়ে কাঠ আঁচড়ালে যেমন হয়। তিনবার। একটু থেমে আবার তিনবার।
শিবুর মন্ত্র থেমে গেল। সে জানত না আসরে আর কী কী ব্যবস্থা আছে। প্রথমে নিশ্চয় কেদারবাবুর কাজ ভেবেছিল। গলা তুলে বলল, ‘কে আছিস? নাম বল।’
কুঠুরির ভেতর থেকে সুখদার গলায় উত্তর এল, ‘আমি গো। খিল খুলে দাও।’
সুখদা আমার পাশেই দাঁড়িয়েছিল। পিতলের বাটিটা পড়ে গেল তার হাত থেকে।
ভেতরের গলা আবার বলল, ‘পুরো খুলতে হবে না।’
ডাক্তারবাবু হাঁটুর ওপর মাথা নামালেন। এমনভাবে কুঁজো হয়ে গেলেন যে কপাল প্রায় মেঝে ছোঁয়। সেই অবস্থাতেই তাঁর মুখ থেকে কথা বেরিয়ে এল।
‘ওরা ওপরে খাচ্ছে, হরি। তুই একটু ফাঁক কর।’
কেদারবাবু পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। হাতের সুতো এখনও আঙুলে জড়ানো। বললেন, ‘অমরেশ, আমার দিকে দেখো। এসব তোমার মনের ভুল।'
ঘটিটা তখনই উলটে গেল।
আমরা সবাই দেখলাম, কেদারবাবুর হাত থেকে সুতো আলগা হয়ে ঝুলছে। কেউ টানেনি। ঘটি গড়িয়ে সিঁড়ির কাছে গেল। থামল। তারপর তার ভেতর থেকে জল পড়তে লাগল।
ঘটিতে জল দেওয়া হয়নি।
কালো জল। কয়লা ধোয়া জলের মতো। মেঝের ঢাল বেয়ে উঠোনের দিকে যাওয়ার কথা, সেটা উলটো দিকে উঠতে লাগল। শিবুর পায়ের কাছে এসে সরু একটি রেখা হয়ে থামল। শিবু উঠে দাঁড়াল। কপালের সিঁদুর ঘামের সাথে গড়াচ্ছে।
‘বাবু, আমি পারব না। আমার বিদ্যে নেই। আমি পেটের দায়ে করি।’
ডাক্তারবাবুর মাথা উঠল।
‘বল।’
‘আমি কিছু জানি না।’
‘সবাই শুনুক।’
শিবু আমাদের দিকে ফিরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমার ভর ছাড়ানো মিথ্যে। সব মিথ্যে।’
কুঠুরির দরজায় তখন ধীরে ধীরে খিল নামানোর শব্দ হল। আমরা কেউ কাছে যাইনি। খিলটা বাইরে। তবু কেউ একজন নামালো। ডাক্তারবাবু এবার নিজের গলায় চিৎকার করলেন।
‘কেদা-আ-আ র, আমার পেছন থেকে একে সরাও।’
জামার পিঠটা ফুলে উঠেছিল। কাপড়ের তলায় একটা মুখ ফুটে উঠছে। প্রথমে নাক, তারপর খোলা মুখের গোল গর্ত। গিন্নিমা মেয়েকে সুখদার কাছে দিয়ে স্বামীর দিকে গেলেন। হাঁটুগেড়ে বসে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর হাত পিঠে পড়তেই ভেতর থেকে কেউ আঙুল কামড়ে ধরল। গিন্নিমা ব্যথায় চিৎকার করে হাত টেনে সরাতে গিয়ে শাঁখা ভেঙে ফেলেন। শাঁখার টুকরোগুলো ছিটকে আমার পায়ে পড়েছিল।
কেদারবাবু কাঁচি দিয়ে জামা কাটলেন। পিঠে কিছু নেই।
সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি ডাক্তারবাবুর বুকের সঙ্গে গিন্নিমার মুখ লেগে আছে। তিনি ছাড়াতে চাইছেন। চুলের খোঁপা খুলে গেছে। মুখ তুলতে পারছেন না। তাঁর হাঁটু মেঝেতে ঘষটে শব্দ করছে। আমি কোমর জড়িয়ে টানলাম। কোনও ফল হল না। একটু পরে তাঁর পা দুটো স্থির হয়ে গেল।
সুখদা মণিকে নিয়ে সদরের দিকে ছুটেছিল। দরজা খোলা ছিল, নিজের চোখে দেখেছি। তারা দেউড়িতে ঢুকল। অথচ পায়ের শব্দ এল আমাদের মাথার ওপর থেকে। দুজনেই ওপরের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। সুখদা রেলিং ধরে নিচে তাকাল। তার মুখের চেহারাটা এখনও মনে আছে।
আবার দৌড়োল। সিঁড়ি দিয়ে নামার আওয়াজ হল। কিন্তু দেখা গেল ওপরের ছাতে।
মণি কাঁদেনি। সে সুখদার আঁচল ধরে পেছন দিকে তাকিয়ে বলছিল, ‘ওখানে যেয়ো না। ওটা ঘর নয়। ওটা বাবার মুখ।’
তারপর ওপরের সব দরজা একসঙ্গে বন্ধ হল।
শিবু নিজের গলার মালা ছিঁড়ে ফেলে হাঁটু গেড়ে বসে কার কাছে যেন কেবল মাপ চাইছিল। তার দুই গাল ক্রমে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। মুখ খুলে বাতাস নিতে গেলে ঠোঁটের ফাঁক থেকে কয়লার গুঁড়ো ঝরছিল। শেষে সে দুহাতে নিজের ঠোঁট টেনে ফাঁক করে ধরে রইল।
কেদারবাবু তখন কুঠুরির কাছে। আমাকে ডাকলেন।
‘খিলটা তোল, হরি। সেদিনের মতো দাঁড়িয়ে থেকো না।’
খিল ধরেছিলাম। কাঠ ঠান্ডা, ভিজে। আঙুল পিছলে যাচ্ছিল। কেদারবাবু নিজে হাত লাগালেন। দুজনে মিলে তুললাম। কপাট ফাঁক হল কিন্তু ভেতর থেকে কোনও মানুষ বেরোল না।
একটা শ্বাস বেরোল। হাহহ্ হ্।
বাড়ির সব প্রদীপ লম্বা হয়ে উঠল। শিখাগুলো দরজার দিকে বেঁকে রইল, অথচ বাতাস লাগল আমাদের উলটো দিক থেকে। কেদারবাবুর চুল কপালের ওপর উড়ে এল। তাঁর চোখের মণি দুটো ওপর দিকে উঠে গেল। হাত বাড়িয়ে দরজার পাল্লা ধরতে গিয়েছিলেন। কিন্তু আঙুলগুলো আর কাঠে ঠেকল না। তার আগেই তিনি আমার গায়ের ওপর পরে গেলেন।
তারপর সব অন্ধকার।
ওপর থেকে মণি একবার ‘মা’ বলেছিল। খুব কাছে, যেন আমার কানের পাশেই। সুখদার গলা আর শুনিনি। শিবুর গলায় একটু খরখর হল, তারপর সেটাও থামল।
আমি হামাগুড়ি দিয়ে সরে যাচ্ছিলাম। হাতে ভাঙা শাঁখা ফুটছিল। কোথায় সদর বুঝতে পারছিলাম না। চারদিকে কেবল লোকের গায়ে হাত ঠেকছিল। কাউকে চেনা যায় না। সকলের গা একই রকম ঠান্ডা, একই রকম ভিজে।
তখন কুঠুরি থেকে ডাক্তারবাবু ডাকলেন।
‘হরি, এখানে আয়। এখানে বাতাস আছে।’
চাকরি করেছি সারা জীবন। মনিবের ডাকে সাড়া দেওয়া পেশীতে ঢুকে গেছে। ঢুকলাম। ভেতরটা ফাঁকা। হাতড়ে দেয়াল পেলাম। হাঁটু গুটিয়ে বসতেই কপাট বন্ধ হল।
বাইরে খিল পড়ল।
তারপর অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর চিৎকার করেছি। যদি কেউ শুনতে পায়, যদি কেউ একটু ফাঁক করে দেয় দরজাটা। পুরোটা নয়। শুধু ঠোঁটটুকু রাখার মতো।
এই পর্যন্তই বলতে পারি, বাবু। পরের ঘটনা তো আমি দেখিনি।
আপনার কাগজে নিশ্চয় আছে। পুরসভার লোকেরা সব লিখে রাখে। কাগজটা একটু নামান দেখি। হ্যাঁ, এই তালিকাটা। অমরেশ দত্ত, সুরবালা দত্ত, মণিমালা দত্ত... সাতটি নামই আছে।
শেষেরটা হরিচরণ দাস। বয়স বাহান্ন। পেশা ভৃত্য।
কী লিখেছে তার নিচে?
‘সিঁড়ির নিম্নস্থিত কুঠুরি হইতে মৃতদেহ উদ্ধার। মুখদ্বার ও শ্বাসনালি কয়লার গুঁড়ায় পূর্ণ। বাম হস্তের তিনটি নখ বিচ্ছিন্ন।’
ঠিকই লিখেছে। বাঁ হাতে খিলের নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।
তারপর কুঠুরির মুখ ইট দিয়ে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল, সেটাও আছে বুঝি? ওই যে আপনি পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন। ওটা দেওয়াল নয়। ওখানেই দরজা ছিল।
না না, আমি আপনার পাশে বসে নেই, বাবু। আমি প্রথম থেকেই এখানে। এই ইটগুলোর ওপাশে। একটু চুন খসিয়ে দিতে পারবেন? আপনার পকেটে ছোট ছুরি দেখলাম। বেশি লাগবে না। ঠোঁটটুকু রাখার মতো।
আরে উঠছেন কেন? সদর তো ওদিকে নয়। ওটা সিঁড়ি। সুখদাও ওই এক ভুল করেছিল।
শুনুন না। একবার হাতটা বুকের ওপর রাখুন। মন দিয়ে লক্ষ্য করবেন। আপনার নিশ্বাস ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও ভেতরে কে অতক্ষণ ধরে শ্বাস নিচ্ছে?
[ হরিচরণ এমনিতে খুব ভালো কিন্তু বন্ধ দরজা দেখলেই অপরদিকে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকতে ভালোবাসে। আজকে রাতে দরজা খোলার সময় না হয় একটু সাবধান থাকবেন। সেটা বেডরুমের দরজা হোক কিংবা বাথরুমের। ]
সুচন্দ্রা দাস
লেখক, আলোকচিত্রী ও শিল্পী।
গল্পে, ছবিতে, শব্দে নিজের মতো করে জীবনকে দেখা।

