suchandradas

রক্তদন্তী – Roktodonti

সরাসরি গল্পে যান
হররবাংলা ছোটগল্প

রক্তদন্তী

রক্তদন্তী কালীর দাঁতে রং করা যাবে না।
‘রং উঠে গেলে?’
‘ও রং ওঠে না।’

গল্পটি পড়ুন
নীল-কালো ভৌতিক ইলাস্ট্রেশনে এক আতঙ্কিত মানুষের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে চুলে ঢাকা অশরীরী মুখ; পেছনে মন্দিরের গর্ভগৃহ।
গল্পের সঙ্গে লেখকের দেওয়া ইলাস্ট্রেশন
রক্তদন্তী ০% পড়া হয়েছে

রক্তদন্তী কালীর দাঁতে রং করা যাবে না।

কাজটা দেওয়ার সময় বেণীমাধব ভট্টাচার্য আমাকে শুধু এই কথাই বলেছিলেন। বারবার।
‘বাকি সব করবে। আঙুলটা গড়বে, কপালের ফাটল বোজাবে, গায়ে রং দেবে। মুখের কাছে কাজ করার সময় একটু সাবধান।’
‘দাঁতগুলো খুব পুরোনো?’
‘তা তো বটেই।’
‘রং উঠে গেলে?’
বুড়ো মানুষটা ফোনের ওপারে চুপ করে গিয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন, ‘ও রং ওঠে না।’

বাবা বেঁচে থাকতে এই মন্দিরের কাজ করতেন। তাঁর মৃত্যুর পরে পুরোনো খদ্দেরদের কয়েকজন আমাকে ডাকতে শুরু করেছেন। সেই সূত্রেই ঝুরিবেড়ায় যাওয়া।

তখনও জানতাম না, বাবা ওই মন্দির থেকে ফিরে কেন কয়েকদিন আমাদের সঙ্গে এক টেবিলে খেতে বসতেন না।
কার্তিকের শেষ। ধান কাটা হয়ে গেছে। বাসরাস্তা থেকে ঝুরিবেড়া তিন মাইল ভেতরে। ভ্যান যে রাস্তায় চলছিল, তার দুপাশে খোঁচা খোঁচা নাড়া। কোথাও ধানের আঁটি উলটে রাখা। শালবনের কাছে পৌঁছোতেই রোদটা বদলে গেল। একই বিকেল, অথচ গাছের নীচে অনেকক্ষণ আগে সন্ধে হয়েছে।

গ্রামের শেষ বাড়িটা ছাড়িয়ে মন্দির। পাশে মজা পুকুর। জলের ওপর কচুরিপানা এত ঘন যে দূর থেকে শক্ত মাটি বলে ভুল হয়। পাড়ের অর্জুনগাছটার একটা ডাল ভেঙে জলে ঝুলছে। ডালের শেষ মাথায় কে কবে যেন লাল কাপড় বেঁধেছিল, রং জ্বলে এখন মাংসের মতো ফ্যাকাশে।

বেণীমাধব চাতালে বসেছিলেন। ছোটোখাটো চেহারা। সাদা চুল ঘাড় ছুঁয়েছে। বাঁ চোখের পাতাটা খানিক নেমে আছে, ডান চোখ অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। ধুতির ওপর পুরোনো সোয়েটার। কাছে যেতেই দেখলাম, গলার ঠিক নীচে বাঁকানো একটা ক্ষতচিহ্ন। বাবার কথা উঠতে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘ও কখনও তোমাকে কিছু বলেনি?’
‘কী বিষয়ে?’
তিনি আমার বাক্সটার দিকে তাকালেন।
‘কাজের কথা।’

আমাকে যে ঘরটা দেওয়া হল, তার দেওয়ালে কোমর পর্যন্ত নোনা। একটা লোহার খাট, তক্তার ওপর পাতলা তোশক। মাথার পাশে দেওয়ালের পলেস্তারা খসে ইট বেরিয়ে আছে। কাঠের তাকটায় পিতলের গ্লাস আর একটা বোতল। পশ্চিমের জানলায় দুটো পাল্লার ওপর আড়াআড়ি পেরেক মারা।

‘খোলে না?’
‘পুকুরের হাওয়ায় স্যাঁতসেঁতে হয়।’
চৌকাঠে দাঁড়িয়ে বেণীমাধব কথাটা বললেন। ঘরে ঢুকলেন না। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ থাকে না, তাই একটা হ্যারিকেনও রেখে গেলেন।

বিকেলে রেণুকা নামের এক মহিলা চা দিতে এলেন। কপালের চুল কদমছাঁট, পরনে সরু নীল পাড়ের শাড়ি। কথাবার্তা কম। চা রেখে আমার খাটের নীচে একবার তাকালেন।

‘কিছু আছে?’ জিজ্ঞেস করলাম।
‘ঝাঁট দেওয়া হয়েছে কি না দেখছিলাম।’
খাটের নীচে ধুলোর মধ্যে কয়েকটা মরা গুবরে পোকা পড়ে ছিল।

বিগ্রহটা নিমকাঠের। মানুষের চেয়ে একটু ছোটো। লম্বা চোখ, ভারী পাতা, মাথার দুপাশে চুলের ঢেউ। পুরোনো রঙের ওপর তেল, ধোঁয়া আর সিঁদুর জমে এমন একটা আবরণ হয়েছে যে আলো না ফেললে মুখের রেখাগুলো আলাদা করে বোঝা যায় না। শুধু দাঁত দেখা যায়। জিভ বেরিয়ে নেই। ঠোঁট সামান্য ফাঁক। সেই ফাঁকের মধ্যে দুপাটি লাল দাঁত। সবগুলো আবার সমান নয়। একটা একটু ভেতরে ঢোকা, একটা সামান্য ঘোরানো। যেন কাঠের মুখে কারও নিজের দাঁত বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আমি টর্চ ফেলে অনেকক্ষণ দেখছিলাম। ওপরের ডানদিকের দাঁত আর নীচের দাঁতের মাঝে একগাছি কালো চুল আটকানো। বেশির ভাগ ভেতরে, অল্প একটু বাইরে বেরিয়ে আছে।

‘ওটা সরাতে হবে,’ বললাম।
বেণীমাধব আমার হাত ধরে নামিয়ে দিলেন।
‘ওটা থাকবে।’
‘দাঁতের কাছে ময়লা জমেছে তো।’
‘থাকুক।’
এই প্রথম তাঁর গলায় রাগ শুনলাম। আমি আর কিছু বলিনি তারপর।

প্রথম রাতে চিবোনোর শব্দে ঘুম ভেঙেছিল।
কড়মড়।
একটু বিরতি।
আবার কড়মড়।

শব্দটা মন্দির থেকে আসছে বলে মনে হয়েছিল। খাটে উঠে বসে কান পেতেই মনে হল, ঘরের দেওয়ালের মধ্যে কিছু একটা শক্ত জিনিস ভাঙছে। মোবাইলে তখন দুটো সতেরো। আলো জ্বালাতেই শব্দ থেমে গেল। খাটের তলায় টর্চ ফেললাম। ধুলো, মরা পোকা। কিছু নেই।

দরজা খুলে বারান্দায় দাঁড়ালাম। চাতালে একটা কুকুর শুয়ে ছিল। মাথা তুলে মন্দিরের দিকে তাকিয়ে আছে। কান দুটো পেছনে চেপে গেছে।

পাশের ঘর থেকে বেণীমাধব বললেন, ‘কী হয়েছে?’
‘কিসের শব্দ হচ্ছে ওটা?’
‘পুরোনো কাঠ। রাতে আওয়াজ হয়।’

তিনি বেরিয়ে এসে আমার দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন।
তাঁর হাতে ঘণ্টা ছিল। আঙুল দিয়ে ঘণ্টার জিভটা চেপে ধরে রেখেছিলেন। পরদিন সকালে দেখি, রেণুকা মন্দিরের চৌকাঠ ধুচ্ছেন। এক বালতি জলে গামছা চুবিয়ে ঘষছেন, আবার ধুচ্ছেন। জলটা গোলাপি।

‘সিঁদুর পড়েছিল?’
মুখ না তুলেই বললেন, ‘আপনি হাতমুখ ধুয়ে নিন।’

চায়ের সঙ্গে মুড়ি দিয়েছিলেন। প্রথম মুঠোটা মুখে দিয়ে চিবোতেই তিনি তাকালেন। তাকিয়েই রইলেন।
‘কী হল?’
‘কিছু না।’

বাটিটা আমার হাতের কাছ থেকে একটু সরিয়ে রাখলেন। আমি আবার কাছে টেনে নিলাম।

যাইহোক, কাজ এগোচ্ছিল। ভাঙা আঙুল জোড়া হল। মুকুটের আলগা অংশ বসালাম। দুপুরে মন্দির ফাঁকা থাকত। বাইরে শুকনো পাতার ওপর কাঠবিড়ালি ছোটার শব্দ হত। পুকুরের ওপার থেকে মাঝে মাঝে বাঁশ কাটার শব্দ ভেসে আসত। আর সেই দিনের বেলাতেও দাঁতগুলোর দিকে তাকালে বেশ অস্বস্তি হত। অদ্ভুতভাবে আলোর সঙ্গে তাদের রং বদলাত না।

সবসময় গভীর লাল।

তৃতীয় দিন দুপুরে কপালের ফাটলে প্রলেপ দেওয়ার সময় দুর্ঘটনাটা ঘটল। বাঁ হাতে ধরা আর রং মোছার ন্যাকড়াটা মুখের কাছে ঠেকেছিল। নামাতে গিয়ে আটকে যাওয়ায় ,না দেখেই টান দিলাম। একটানে চুলটা বেরিয়ে এল। আর সঙ্গে সঙ্গে কাঠের মুখের ভেতর থেকে একটা নিশ্বাস আমার কবজির ওপর পড়ল। ঠিক ঘুমন্ত মানুষের নিশ্বাসের মতো। উষ্ণ। সামান্য ভেজা। আমি বিদ্যুৎ বেগে হাত সরিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

প্রতিমা একইভাবে তাকিয়ে আছে। ঠোঁট নড়েনি। ন্যাকড়ার সঙ্গে আটকে থাকা চুলটা ছাড়ালাম। প্রায় আধহাত লম্বা। অদ্ভুতভাবে ভেজা। একবার মনে হল, আমার আঙুলের ফাঁকে একটু গুটিয়ে লেগে আছে। আমি ঝেড়ে সেটা মেঝেতে ফেলে দিলাম। দশ মিনিট পরে বেণীমাধব এসে বিগ্রহের দিকে একবার তাকিয়েই থেমে গেলেন।
‘কোথায়?’
মেঝেটা দেখালাম।
চুল নেই।

আমরা দুজনে অনেকক্ষণ খুঁজলাম। বেদির নীচে, ফুলের সাজিতে, আমার কাজের বাক্সে। মন্দিরের ছোট্ট ঘরটায় লুকোনোর বিশেষ জায়গা ছিল না। বেণীমাধব একসময় সিঁড়িতে ধপ করে বসে পড়লেন।

'খুলে বলুন তো ব্যাপারটা কী।’
তিনি আমার দিকে তাকালেন। সেই উজ্জ্বল চোখটায় জল।
‘আজ তোমাকে যেতে দেওয়া যাবে না।’
‘কেন?’
‘চুলে তোমার হাত লেগেছে। ওটা কোথায় আছে জানি না। তোমার সঙ্গে ওটার একটা চুলও মন্দিরের বাইরে বেরোলে আর কিচ্ছুটি করতে পারব না।’

রাগ হয়েছিল। চুল সরিয়েছি বলে এসব কী। কিন্তু তর্ক করার আগে বিগ্রহের দিকে তাকালাম। দাঁতের লাল রং ফিকে হয়ে আসছে।

সূর্য ডোবার আগেই রেণুকা খাবার দিয়ে গেলেন। অন্যদিনের মতো থালা চাপা দিয়ে তাড়াতাড়ি চলে গেলেন না। দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কেউ নাম ধরে ডাকলে উত্তর দেবেন না।’ বেণীমাধব তাঁকে থামাতে গেলেন। রেণুকা বললেন, ‘সব কথা খুলে না বললে মানুষ ভুল করতে পারে।’ তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘চেনা গলা হলেও না। বিশেষ করে চেনা গলা হলে আরও সাবধান।’

বেণীমাধব এবার আমার ঘরে এসে বসলেন। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তাঁর ঠাকুরদার আমলে গ্রামে প্রথম ডাক শোনা গিয়েছিল। মৃত মানুষের গলা। কারও মায়ের, কারও স্বামীর। যারা উত্তর দিয়েছিল, প্রথমে তাদের নিজের গলা বদলে গেল। তারপর খাওয়ার সময় একটা বাড়তি শব্দ হত।
‘কীসের শব্দ?’
বুড়ো উত্তর দিলেন না।
আমার মনে পড়ল, মুড়ি খাওয়ার সময় রেণুকা তাকিয়ে ছিলেন।
‘তারপর?’
‘এক রাতে পাঁচটা বাড়িতে সবাই মরে গেলো।’
‘কী করে মারা গিয়েছিল?’

বেণীমাধব তাঁর গলার দাগে হাত রাখলেন। ‘ঠাকুরদা লিখে গেছেন, বাইরে থেকে শরীরে কোনও পরিবর্তন বোঝা যেত না। মুখের ভেতরটা দেখেও মানুষ চিনতে পারতেন না।’ সেই ঘটনার পরে তাঁর ঠাকুরদা রক্তদন্তীর সামনে বসেছিলেন। তিন দিন দরজা খোলেননি। চতুর্থ দিনের সকালে বিগ্রহের দাঁতে কালো চুল দেখা যায়। গ্রামে ডাক থেমে যায়।
‘তাহলে এতদিন....’
‘মা ধরে ছিলেন।’
প্রদীপের আলোয় তাঁর গলার ক্ষতটা স্পষ্ট দেখাচ্ছিল।
‘আপনার ওই ক্ষতটা?’
বুড়ো চোখ নামালেন।
‘অনসূয়া মারা যাওয়ার পরে এক রাতে শুনেছিলাম, ও জল চাইছে। মন্দিরের বন্ধ দরজার ওপার থেকে। তোমার বাবা সেবার এখানে ছিল।’

আমার বুকের মধ্যে ধীরে ধীরে কিছু একটা ঠান্ডা হয়ে এল। বাবা ফিরে এসে কয়েকদিন গরম ভাত খেতে পারতেন না। বলতেন, গলায় ঘা।
‘তোমার বাবাকে মন্দিরে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় এই কামড়টা খেয়েছিলাম,’ বেণীমাধব বললেন। ‘পরে যদিও ওর কিছু মনে ছিল না।’
তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
‘আমি পাশের ঘরেই আছি। আলো জ্বেলে রাখবে। কিছু শুনলে উত্তর দেবে না। দরজায় খিল দেবে না। দরকার হলে আমাকে ঢুকতে হবে।’

রাতে নন্দিতাকে ফোন করেছিলাম। সিগন্যাল বারবার চলে যাচ্ছিল।
‘গলাটা কেমন শোনাচ্ছে তোমার,’ ও বলল।
‘ঠান্ডা লেগেছে।’
‘ফিরবে কবে?’
‘কাল।’
ফোনটা কেটে যাওয়ার পরেও অনেকক্ষণ কানে ধরে রেখেছিলাম। তারপর বুঝলাম, ওপার থেকে কারও শ্বাস পড়ছে। স্ক্রিনে কিন্তু কল চলছে না।

ফোনটা বিছানায় ছুড়ে দিলাম। হ্যারিকেনের সলতে বাড়িয়ে খাটে বসলাম। ঘরের সমস্ত জিনিস দেখা যাচ্ছে। পেরেক মারা জানলা, দেওয়ালের নোনা, তাকের পিতলের গ্লাস।

একসময় মশার শব্দ থেমে গেল। পুকুরের ব্যাঙও আর ডাকছিল না। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে মা বলল, ‘অয়ন, জল খাবি?’
ডাকটা উঠোন থেকে আসেনি। খাটের নীচ থেকে এসেছে।
সাত বছর আগে মাকে দাহ করে এসেছি। শেষদিকে শ্বাস নিতে কষ্ট হত। একটা লাইন কথা বলতে গেলেও মাঝখানে একটু থামতে হত। সেই বিরতিটুকুও একই রকম।

আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। খাটের নীচে কাপড় সরানোর শব্দ।

‘গ্লাসটা অত দূরে রেখেছিস কেন?’
পিতলের গ্লাসটা তাকে। আমি তাকিয়ে রইলাম। সেটা নড়ল না। মায়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল হাসপাতালে। তখন কাজের জন্য বাইরে ছিলাম। ফিরে হাসপাতালে পৌঁছেছিলাম ভোরে। মা আর কথা বলতে পারেনি। শুধু আমার হাতটা দুবার টেনেছিল। কিছু চাইছিল কি না বুঝতে পারিনি।
খাটের নীচ থেকে গলা বলল, ‘সেবারও তো জল চেয়েছিলাম। দিলি না।’

আমি দুহাতে মুখ চেপে ধরলাম। হ্যারিকেনের শিখা লম্বা হয়ে উঠেছে। দেওয়ালে আমার ছায়া পড়েছে। সেই ছায়ার মাথার পাশে আরেকটা মাথা উঠল। ধীরে ধীরে।
আমার ডান কাঁধের ঠিক ওপরে।

কাঁধে কিছু ঠেকছে না। শুধু কানের কাছে গরম নিশ্বাস।
‘একবার তাকা। কতদিন তোকে দেখিনি।’
চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। জানতাম, তাকানো চলবে না। সাড়া দেওয়া চলবে না। তবু গলার ওই ক্লান্তিটা, শ্বাসের ওই টান, মায়ের শেষ কয়েকটা মাস যেন ঘরের মধ্যে ফিরে এসেছে।

‘তোকে দেখতে না পেয়ে চোখ দুটো বন্ধ করতে পারিনি রে।’
আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘মা?’
ঘরের সমস্ত শব্দ একসঙ্গে আমার মুখের মধ্যে ঢুকে গেল।
মনে হল, গলার ভেতর দিয়ে ঠান্ডা, ভেজা কাপড় টেনে নামানো হচ্ছে। শ্বাস আটকে এল। মুখ হাঁ করতে গেলাম, চোয়াল খুলল না।

দেওয়ালে দ্বিতীয় মাথাটা নেই।
ছায়া এখন একটাই।

শুধু তার মুখ আমার চেয়ে অনেকখানি বড়ো। দরজা ঠেলে বেণীমাধব ঢুকলেন। আমি খাটের ওপর সোজা হয়ে বসে। নিজের শরীরের ভেতরে আমার অনেকটা জায়গা কমে গেছে। বুকের মধ্যে চাপ। জিভের গোড়ায় কিছু একটা গুটিয়ে শুয়ে আছে।

বেণীমাধব এগিয়ে আসতেই আমার মুখ বলল, ‘এত রাতে এলে কেন, বেণু?’
মেয়েলি গলা।
বুড়ো থমকে দাঁড়ালেন।
আমার ঠোঁটের কোণ নিজের থেকে একটু উপরে উঠে গেল।
‘মশারিটা টাঙাবে না? আমার একা হাতে হয়?’

অনসূয়া। তাঁর মৃত স্ত্রী। বেণীমাধব চোখ বুজলেন। নিজের নীচের ঠোঁটে এমন জোরে কামড় দিলেন যে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। তারপর আমার হাত ধরে টানলেন। আমি উঠতে চাইছিলাম। শরীর উঠছিল না। খাটের লোহার পায়া মেঝেতে ঘষটে গেল। টেবিলের গ্লাস পড়ে গিয়ে গড়িয়ে গেল। সেই আওয়াজের ভেতরে শুনলাম, আমার গলা দিয়ে হাসি বেরোচ্ছে।

বুড়ো আমাকে প্রায় টেনে বারান্দায় আনলেন। মন্দিরের দরজা খোলা। ভেতরে প্রদীপ জ্বলছে। কুয়াশার জন্য আলোগুলো ঝাপসা।

চাতালে পা পড়তেই আমার হাঁটু উলটোদিকে মুড়ে যাওয়ার উপক্রম হল। পায়ের আঙুল দিয়ে মাটি খামচে ধরলাম। আমি করিনি। আমার পা করেছে।
বেণীমাধব বলছিলেন, ‘আর একটু। আর একটু।’
আমার মাথা ঘুরে তাঁর কাঁধের ওপর ঠেকল।
মায়ের গলায় বললাম, ‘অয়ন, যাস না। ওখানে গেলে আমায় আর পাবি না।’

বুড়ো আমাকে ধাক্কা দিয়ে চৌকাঠ পার করালেন। দেবীর দাঁত সাদা হয়ে গেছে। সম্পূর্ণ সাদা। মুখের ফাঁকটুকুর ভেতর এতটা অন্ধকার আমি কখনও দেখিনি। প্রদীপের আলো ঠোঁট ছুঁয়ে থেমে যাচ্ছে। তার পেছনে কিছু নেই, অথচ সেই কিছু না থাকাটা অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে।

আমার ঘাড় পেছনে বেঁকে গেল।

জিভের গোড়া থেকে একটা চুল উঠে এল। ঠোঁটের ওপর দিয়ে নেমে বুকে ঠেকল। তারপর আরও। কাশতে পারছিলাম না। বমি করতে পারছিলাম না। চুলের গোছা গলা দিয়ে উঠছে, তার সঙ্গে ভেতর থেকে কেউ আমার চোয়াল ঠেলে বড়ো করছে।

একটা হাত বেরোল।

মানুষের হাতের মতো, কিন্তু আঙুলগুলোয় বাড়তি গাঁট। সেই হাত আমার নীচের পাটির দাঁত আঁকড়ে ধরল। অন্য হাতটা ওপরের পাটি ধরে চাপ দিতে লাগল। ঠোঁটের কোণে গরম ব্যথা ছড়িয়ে গেল। আমার মুখের মধ্যে আরেকটা মুখ খুলছে।

বেণীমাধব মেঝেতে মাথা ঠুকে বলছিলেন, ‘মা, ধরে নাও। মা, ধরে নাও। মা গো....’

চুলের ভেতর থেকে একটা চোখ দেখা গেল। সেই চোখ আমার দিকে তাকাতে পারার কথা নয়। চোখটা তো আমার মুখ দিয়ে বাইরে বেরোচ্ছে। তবুও আমাকেই দেখছিল। চোখের পাতায় মায়ের সেই ছোট্ট আঁচিলটা।
আমি আর ধরে রাখতে পারলাম না নিজেকে। কাঁদতে চাইলাম।

তখনই বিগ্রহের মুখের ভেতর থেকে টান পড়ল।
আমার বুক মেঝে থেকে উপরে উঠে গেল। দুই হাতের নখ পাথরের ওপর ঘষটে যাচ্ছিল। চুলগুলো সোজা হয়ে টানটান। ভেতরের জিনিসটা আমার দাঁত আরও শক্ত করে ধরেছে। বেণীমাধব আমার কোমর জড়িয়ে পিছিয়ে টানছেন। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, আমার শরীরটা দুদিকে ছিঁড়ে যাবে।

ঠিক তখন ভেতরের আঙুলগুলো দাঁত ছেড়ে দিল। জিভের তলায় ছোট্ট কিছু একটা সরে গেল। ঠান্ডা। সরু।
বাকি কালো দলাটা এক ঝটকায় মুখ থেকে বেরিয়ে গেল।

আমি প্রতিমার ঠোঁট নড়তে দেখিনি। শুধু দুপাটি দাঁত এক হল। শব্দটা মন্দিরে হয়নি। আমার মাথার ভেতরে হয়েছিল।
কড়মড়।
তারপর সেই পরিচিত দীর্ঘ বিরতি।
আবার কড়মড়।

ভোরে জ্ঞান ফিরেছিল আমার ঘরে। খাটের পাশে রেণুকা বসে। বেণীমাধব নেই। গিলতে কষ্ট হচ্ছিল। ঠোঁটের দুপাশে ওষুধ লাগানো। জামার বুক ভেজা।
‘উনি কোথায়?’
নিজের গলা শুনে চমকে গেলাম। খুব ক্ষীণ, কিন্তু আমারই।
রেণুকা বললেন, ‘মন্দিরে।’

তিনি জল খাইয়ে দিলেন। গ্লাসের ধারে ঠোঁট ঠেকানোর সময় তাঁর হাত কেঁপে উঠেছিল। দুপুরে গ্রামের ডাক্তার এলেন। গলার ভেতর আলো ফেললেন। চোয়ালে চাপ দিয়ে দেখলেন। বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, পড়ে গিয়েছিলাম কি না।

বেণীমাধব বললেন, ‘খিঁচুনি হয়েছিল।’
আমি প্রতিবাদ করিনি।
তিন দিন পরে ফিরে আসি।
যাওয়ার আগে মন্দিরে ঢুকেছিলাম। রক্তদন্তীর দাঁত আবার লাল। ডানদিকের ফাঁকে কালো চুল। বেণীমাধব বেদির কাছে বসেছিলেন। তিন দিনে যেন দশ বছর বয়স বেড়ে গেছে।

‘বাবা এসব জানত?’
তিনি মাথা নাড়লেন।
‘আমাকে বলেনি কেন?’
বুড়ো কোনও উত্তর দিলেন না। বাইরে এসে আমার হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিলেন। কাজের বাকি পাওনার চেয়ে বেশি।
‘যদি গলায় আবার....’
কথাটা শেষ করলেন না।
আমি বললাম, ‘ফোন করব।’
তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

শহরে ফিরে প্রথম দুমাস সব ঠিক ছিল। নন্দিতাকে বলেছিলাম, অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। রাতে আলো জ্বেলে ঘুমোনো নিয়ে ও আপত্তি করেনি। ঘুমের মধ্যে চমকে উঠলে পিঠে হাত বুলিয়ে দিত।

একদিন খেতে বসে বাড়তি শব্দটা পেলাম। আমি ভাত চিবিয়ে থেমেছি। মুখের ভেতরে আরেকবার চিবোনোর শব্দ হল।

খুব আস্তে।

ভেবেছিলাম, চোয়ালের হাড়ে সমস্যা। ডেন্টিস্ট দেখালাম। এক্স-রে হল। তিনি বললেন, ঘুমের মধ্যে দাঁত চেপে রাখার অভ্যাসে এমন হতে পারে।

বেণীমাধবকে ফোন করেছিলাম। প্রথম দুদিন ফোন বন্ধ। তৃতীয় দিন অন্য একজন ধরলেন। মারা গেছেন। ঘুমের মধ্যে। আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারিনি। পরদিন ঝুরিবেড়া যাওয়ার টিকিট কাটলাম।

সেই রাতেই নন্দিতা বলল, ‘তুমি আজকাল খেতে বসে হাসো কেন?’
‘হাসি?’
‘আমার দিকে তাকিয়ে। মুখ বন্ধ করে। চোখদুটো অদ্ভুত লাগে।’
আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম অনেকক্ষণ। ঠোঁট সরিয়ে দাঁত দেখেছি। জিভ তুলেছি। জিভের তলায় কালো একটা রেখা। সরু। টুইজার আনতে গিয়েও থেমে গেলাম।
ভোরে বেরোনোর কথা ছিল। টিকিট আর পরিচয়পত্র টেবিলে রেখে ব্যাগ গোছাচ্ছি। নন্দিতা রান্নাঘরে চা করছে।

তখনই আমার গলা ওকে ডাকল।
‘নন্দিতা।’
আমি ডাকিনি।

ব্যাগের ওপর আমার হাত স্থির হয়ে গেল। ঠোঁট শক্ত করে চেপে রেখেছি। তবু গলাটা আবার ডাকল।
এবার আরও স্পষ্ট।
‘একবার এদিকে এসো তো।’
আমি ছুটে যাওয়ার আগেই রান্নাঘর থেকে উত্তর এল—
‘কী হল?’
মুখের ভেতরের চাপটা সঙ্গে সঙ্গে কমে গেল। এতদিন বুকের মধ্যে যে ভারটা ছিল, সেটা নেই। জিভের গোড়া হালকা। অনায়াসে শ্বাস নিতে পারছি।

নন্দিতা চায়ের কাপ হাতে দরজায় এসে দাঁড়াল। ওর চোখ থেকে জল পড়ছে।
‘কী হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করলাম।
উত্তর দিল না। শুধু মাথাটা একটু কাত করল। তারপর বন্ধ ঠোঁটের পেছনে একটা হালকা হাসি। হাসিটা আসছিল গলার বেশ কিছুটা নীচ থেকে।

মা অমন করেই হাসত।

~ Suchandra Das

#suchandraofficial

সুচন্দ্রা দাস

লেখক, আলোকচিত্রী ও শিল্পী।
গল্পে, ছবিতে, শব্দে নিজের মতো করে জীবনকে দেখা।

গল্পটা মনে থেকে গেল?